শরতের সোনালী রোদ্দুর আর হিমেল হাওয়ার পরশ পেরিয়ে প্রকৃতি যখন হেমন্তের সোনালী চাদরে মুড়ে যায়, ঠিক তখনই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ও উজ্জ্বল উৎসব দিপাবলী বা দীপাবলি উপস্থিত হয়। আলো, আনন্দ, আশা এবং ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত এই উৎসব শুধু ভারত উপমহাদেশেই নয়, আজ বিশ্বজুড়ে এক সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে। অন্ধকারকে হটিয়ে আলোর জয়গান গাওয়াই দিপাবলীর মূল বার্তা।
দিপাবলীর পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
দিপাবলীর ইতিহাস ও ঐতিহ্য হাজার বছরের পুরনো। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক গাথা।
সবচেয়ে প্রচলিত কাহিনীটি রামায়ণভিত্তিক। চৌদ্দ বছরের বনবাস শেষে এবং লঙ্কার অধিপতি রাবণকে বধ করে অযোধ্যার রাজা রামচন্দ্র, সীতা দেবী এবং লক্ষণকে সঙ্গে নিয়ে নিজ রাজ্যে ফিরেছিলেন। অযোধ্যাবাসীর কাছে তাদের এই প্রত্যাবর্তন ছিল এক পরম আনন্দের মুহূর্ত। দীর্ঘ অন্ধকার যুগ পেরিয়ে রামের রাজ্যে সুদিন ফেরার আনন্দে অযোধ্যার প্রজারা সমগ্র নগরীকে মাটির প্রদীপের আলোয় আলোকিত করে তুলেছিল। সেই থেকে অশুভ শক্তির বিনাশ এবং সত্য ও ন্যায়ের বিজয়ের প্রতীক হিসেবে প্রতি বছর এই দিনটিতে প্রদীপ প্রজ্বলন করা হয়।
অন্যদিকে, শিখ সম্প্রদায়ের কাছেও এই দিনটি অত্যন্ত পবিত্র। ১৬১৯ সালে শিখদের ষষ্ঠ গুরু হরগোবিন্দ সিংজি মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে ফিরেছিলেন। তার সঙ্গে ৫২ জন রাজাও মুক্তি পান। এই দিনটিকে শিখ ধর্মে ‘বন্দী ছোড় দিবস’ হিসেবে উদ্যাপন করা হয়।
এছাড়া দক্ষিণ ভারতে বিশ্বাস করা হয়, এই দিনেই ভগবান কৃষ্ণ নরকাসুর নামক অত্যাচারী অসুরকে বধ করে পৃথিবী থেকে অন্ধকার ও ত্রাসের অবসান ঘটিয়েছিলেন।
আলোর উৎসব ও তার আধ্যাত্মিক অর্থ
দিপাবলী শব্দটির অর্থ হলো ‘প্রদীপের সারি’। কিন্তু এই উৎসবের আসল তাৎপর্য কেবল মাটির প্রদীপ বা বৈদ্যুতিক আলোয় ঘর সাজানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর রয়েছে এক গভীর আধ্যাত্মিক রূপ।
বাহ্যিক প্রদীপের আলো আমাদের চারপাশের অন্ধকার দূর করে, আর অন্তরের প্রদীপ বা জ্ঞানালো জ্বালানো আমাদের মনের ভেতরের লোভ, হিংসা, অহংকার, অজ্ঞতা এবং নেতিবাচকতার অন্ধকার দূর করে। মানুষ যখন নিজের ভেতরের কুসংস্কার ও অজ্ঞতা দূর করে প্রজ্ঞার আলোয় আলোকিত হয়, তখনই দিপাবলীর প্রকৃত সার্থকতা আসে।
উৎসবের রূপ ও আচার-অনুষ্ঠান
দিপাবলী সাধারণত ৫ দিন ধরে পালিত হয়, যার মূল আকর্ষণ থাকে তৃতীয় দিন বা মূল দিপাবলীর রাত।
ধনতেরাস: এই দিনটিকে সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক মনে করা হয়। মানুষ নতুন ধাতু, বিশেষ করে সোনা, রূপো বা তামা এবং বাসনপত্র কিনে থাকে।
নরক চতুর্দশী: অশুভ শক্তি ও অলক্ষ্মী দূর করার জন্য ভোরে স্নান করে প্রদীপ জ্বালানো হয়।
দিপাবলী ও লক্ষ্মীপূজা: মূল উৎসবের রাতে ঘরে ঘরে মা লক্ষ্মী এবং ভগবান গণেশের পূজা করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই রাতে মা লক্ষ্মী পৃথিবীতে আসেন এবং যে ঘর পরিষ্কার, আলোকিত ও সুন্দর থাকে, সেখানেই তিনি আশীর্বাদ বর্ষণ করেন।
গোবর্ধন পূজা: প্রকৃতি ও গো-মাতাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে গোবর্ধন পর্বত ও কৃষ্ণের পূজা করা হয়।
ভাই ফোঁটা: ভাই ও বোনের অটুট সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে এই উৎসবের মধ্য দিয়ে দিপাবলীর সমাপ্তি ঘটে।
আধুনিক যুগে দীপাবলি: পরিবর্তন ও সচেতনতা
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দিপাবলীর উদ্যাপন পদ্ধতিতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। একসময় যেখানে শুধু মাটির প্রদীপ ও মোমবাতির আলোয় চারপাশ সেজে উঠত, সেখানে আধুনিক যুগে শব্দবাজি ও আতশবাজির দাপট বাড়ায় পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছিল।
তবে আনন্দের বিষয় হলো, বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষ এখন শব্দহীন ও পরিবেশবান্ধব আলোর উৎসবের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। প্রচুর পরিমাণ মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে স্থানীয় কুমোরদের জীবিকায় সহায়তা করার পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা করার প্রবণতা বাড়ছে। আতশবাজির ধোঁয়া ও শব্দের বদলে মিষ্টিমুখ, উপহার বিনিময়, একে অপরকে জড়িয়ে ধরা এবং গরিব-দুঃখীদের মধ্যে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমেই দিপাবলী আজ তার আসল রূপ ফিরে পাচ্ছে।
অন্ধকারকে সরিয়ে আলোর ধারায় নতুন জীবন
দিপাবলী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রাতের অন্ধকার যতই ঘনিয়ে আসুক না কেন, একটি ছোট প্রদীপের আলোও তাকে পরাজিত করতে সক্ষম। সমাজ থেকে হানাহানি, বিদ্বেষ ও হতাশার অন্ধকার দূর করে সম্প্রীতি, মৈত্রী ও আশার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই দিপাবলী তার শাশ্বত বাণী সার্থক করে তোলে। আলো জ্বেলে যাক আলো, প্রতিটি মনে ফুটুক আনন্দের অম্লান হাসি এই হোক দিপাবলীর চিরন্তন প্রার্থনা।