Monday 26 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য বিমোচন

ড. মিহির কুমার রায়
২৬ অক্টোবর ২০২৬ ১৬:০৭ | আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০২৬ ১৬:০৮

একটি দেশ উন্নয়নের কোন স্থরে রয়েছে তার একটি নিয়ামক হলো মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি)-এর হার যা অর্থনৈতিক উন্নয়নের অনেক স্থর বিবেচনা করে তা নির্ধারণ করা হয়। তবে প্রবৃদ্ধি মানে উন্নয়ন নয়। কোন দেশের অথনৈতিক অবস্থার গাণিতিক সূচক হিসাবে জিডিপির ধারণার প্রথম প্রস্তাব করেন আমেরিকান অর্থনীতিবিদ সায়মন কুজনেট ১৯৩৭ সালে যেখানে তিনি দেখাতে চেষ্টা করেন জিডিপি কিভাবে একটি দেশের সার্বিক অর্থনীতির উন্নতি ও অবনতি নির্দেশ করে। তার মতে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জিডিপি শুধু আর্থিক অবস্থার সূচক উন্নয়নে নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে আইএমএফ বিশ্বব্যাংক একযোগে জিডিপিকে উন্নয়নের সূচক হিসাবে ব্যবহার করতে শুরু করে পরবর্তীতে এটাকেই উন্নয়নের পরিমাপ বলে গ্রহণ করে নেয়। তবে অনেক গবেষকই উন্নয়ন পরিমাপের ভ্রান্ত ধারণার সীমাবদ্ধতার ব্যাপারে সোচ্চার ছিলেন যার মধ্যে সর্বাগ্রে ছিলেন মোজেস আব্রামোভিজ যিনি ১৯৫৯ সালেই এর সমালোচনা করছেন। আর ২০১৯ সালে অর্থনীতিতে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক জোসেফ স্টিগলিতজ জিডিপিকে বাতিল করার আহ্বান জানান। তবে পঞ্চাশ দশকের ধ্রুপদি উন্নয়ন অর্থনীতিবিদরা বলেন টেকসই উন্নয়ন প্রবৃদ্ধির জন্য অর্থনৈতিক বিকাশ শ্রমসাধ্য অথচ দেশীয় সঞ্চয় বৃদ্ধি অপরিহার্য এবং অর্থনীতিবিদ পেইকাং, রয় এফ হ্যারোড, ইভজি ডোমার ও রাবর্ট সলো দেখিয়েছেন দারিদ্র্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য দেশীয় সঞ্চয় বৃদ্ধি কতটা জরুরী। তাদের বক্তব্য ছিল কৃষি কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করা কৃষকও জানেন ভবিষ্যতে উন্নতির জন্য যা দিয়ে জমি, কৃষি উপকরণ, যন্ত্রপাতি ক্রয় করা যায় যেখান থেকে বেশি ফসল উৎপাদন সম্ভব হয়। পঞ্চাশের দশকের প্রথম দিকে চীন দেশীয় সঞ্চয় বৃদ্ধির মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ শুরু করে যার ফলে সত্তর দশকের শেষ দিক থেকে চীনের জিডিপি কখনও বিশ শতাংশের নিচে নামেনি যা ২০০৮ সালে ৫২ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছানোর ঘটনা ঘটে।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে চলতি২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। জ্বালানি ও আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং কম রাজস্ব আহরণের কারনে ২০২৩ সাল থেকে প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে আছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে বিনিয়োগ কমেছে, রপ্তানি গতি হারিয়েছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে ক্রয়ক্ষমতা কমেছে, বেড়েছে ব্যবসার খরচ। তবে রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ উন্নত হওয়ায় বাহ্যিক খাত স্থিতিশীল ছিল। জ্বালানি সরবরাহ ধীরে ধীরে সহজ হলে এবং সংস্কার গতি পেলে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।

বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে। আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যে পড়েছে। কর্মসংস্থান থমকে গেছে, নারীরা চাকরি হারিয়েছেন। টানা চার বছর দারিদ্র্য বেড়েছে: বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দৈনিক ৩ ডলারের দারিদ্র্যসীমায় দারিদ্র্যের হার ১ দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে। জাতীয় দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী, দারিদ্র্যের হার টানা চতুর্থ বছরের মতো বেড়েছে। ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে তা আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে উঠেছে। একই সময়ে আয়বৈষম্যও বেড়েছে। খেলাপি ঋণের হার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের জুনে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ হয়েছে। ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোয় এই হার ৫৮ দশমিক ৯ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোয় ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ। ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন ও আমানত সুরক্ষা আইন পশ করাকেইতিবাচক বলেছে বিশ্বব্যাংক। তবে দুর্বল ব্যাংককে বারবার ছাড় ও তারল্য সহায়তা দেওয়ায় প্রকৃত লোকসান শনাক্ত ও সমাধানের প্রক্রিয়া পিছিয়ে যাচ্ছে।

প্রতিবেদনেআরও বলা হয়, জিডিপির ৮ দশমিক ৩ শতাংশ রাজস্ব আহরণ বিশ্বের সর্বনিম্নগুলোর একটি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি আগের অর্থবছরের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানবিষয়ক কান্ট্রি ডিরেক্টর বলেছেন, বেসরকারি বিনিয়োগনির্ভর অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে ফিরতে ব্যাংকিং, রাজস্ব আহরণ এবং জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার দরকার। দরিদ্রদের সুরক্ষা ও ভালো কর্মসংস্থানের জন্য এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার সময়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি ও কৃষিতে ভর্তুকি থাকলেও সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারগুলোর প্রায় অর্ধেক কোনো সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই। প্রতিবেদনে ডায়নামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি বাস্তবায়নকে গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়েছে। একাধিক খাদ্য ভর্তুকি একীভূত করা এবং ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে নগদ সহায়তা কর্মসূচির উন্নত লক্ষ্যনির্ধারণ যুক্ত করলে আরও ২৮ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে দারিদ্র্য থেকে তোলা সম্ভব।

ব্যাংক খাতে সম্পদের মান পর্যালোচনা দ্রুত শেষ করে কোন ব্যাংক টিকে থাকতে পারবে, তা নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ব্যাংকের মালিক, বিনিয়োগকারী ও অন্য অংশীজনদের লোকসানের দায় বহন এবং নিয়ন্ত্রক ছাড় পর্যায়ক্রমে তুলে নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। জ্বালানি খাতে দেশীয় গ্যাস উত্পাদন ও এলএনজি অবকাঠামো বাড়ানো, বিদ্যুতের সঞ্চালন ও বিতরণব্যবস্থা উন্নত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প গ্রহণ ও বিদ্যুত্ কেনায় স্বচ্ছ এবং প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করতেও বলা হয়েছে। রাজস্ব বাড়াতে করনীতি ও কর প্রশাসনকে আলাদা করা, সরকারি সংস্থাগুলোর তথ্য সমন্বয় করে কর ফাঁকি শনাক্ত করা এবং অকার্যকর করছাড় পর্যায়ক্রমে কমানোর সুপারিশ করেছে বিশ্বব্যাংক। একই দিন প্রকাশিত ‘সাউথ এশিয়া ইকোনমিক আপডেট’ অনুযায়ী, ২০২৬ সালে দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ, আর ২০২৭ সালে তা কমে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ হবে। বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেন, এআই মূল্য শৃঙ্খলার সুযোগ কাজে লাগাতে দক্ষতা, অবকাঠামো ও সহায়ক পরিবেশে বিনিয়োগ করতে হবে।

বাংলাদেশকে এখন আর কৃষিপ্রধান দেশ বলা য়ায় না তা এখন সেবা প্রধান দেশ হিসাবে পরিচিত যেখানে এই খাতের অবদান জিডিপির ৫৫ শতাংশ, শিল্প খাতের অবদান ৩৫ শতাংশ এবং কৃষি খাতের অবদান ১০ শতাংশ। যদিও এখন পর্যন্ত ৪৬ শতাংশ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল। কৃষির সঙ্গে দারিদ্র্যের ও খাদ্য নিরাপত্তার একটি সু-সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণা বলছে কেবল জমির কিংবা কৃষির উপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোই দারিদ্র্য, আবার মহিলা প্রধান গৃহস্থালি পরিবারগুলোই দারিদ্র্য যার সংখ্যা বিবিএস এর তথ্য মতে মোট জনসংখ্যার ২১ ভাগ যা সংখ্যা তথ্যের ভিত্তিতে ৩ কোটি ৬৫ লাখ। আবার হতদরিদ্রের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার শতকরা ৯ ভাগ অর্থাৎ ব্যাপক গণদারিদ্র্য বাংলাদেশে একটি বড় বৈশিষ্ট্য যা বিশ্বব্যাংকের দারিদ্র্য ও অংশীদার শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। যেখানে দেখানো হয়েছে দেশের হতদারিদ্র্য সংখ্যা ২.৪১ কোটি যারা দৈনিক ৬১.৬০ টাকা করে আয় করতে পারে না। অথচ আয়ের বৈষম্য এত প্রকট যে ধনী বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ বিশ্বের এক নম্বর স্থানে রয়েছে। যেমন বাংলাদেশে ২০০৫ সালে গিনি সহযগ ছিল ০.৪৬% যা ২০১৬ সালে ছিল ০.৪৮%। অনুমান করা যাচ্ছে বর্তমানে তা বেড়ে দাড়িয়েছে ০.৬০% এর কাছাকাছি যা কাম্য নয়। একটি প্রবাদ প্রচলিত আছে গিনি সহযগ যদি ০.৫০% এর উপরে চলে যায় তা হলে সেই দেশ বিশ্বের আয় বৈষম্যেও দেশের তালিকায় চলে যায় যা বাংলাদেশের ব্যাপাওে হয়েছে ।সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশ একটি ক্রান্তিকালের দিকে যাচ্ছে যাকে বলা হয় নীতির জড়তা যা এমন একটি পরিস্থিতি যেখানে অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় নীতি আইন ও সংস্কার গৃহীত হয় না যদি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব থাকে। অর্থাৎ নীতিমালা বেশির ভাগ কাগজেই সীমাবন্ধ থাকে যা উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের একটি বড় বাধা।

লেখক: অধ্যাপক, গবেষক

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর