বাঙালি সংস্কৃতিতে ঈদ মানেই একরাশ আনন্দ, আর সেই আনন্দের পূর্ণতা পায় হাতের তালুতে আঁকা মেহেদির লাল আভায়। চাঁদরাতের সেই চিরচেনা দৃশ্য।সবাই মিলে গোল হয়ে বসে একে অপরের হাতে নকশা করা, হাসাহাসি আর গল্পের আড্ডা। মেহেদি কেবল একটি প্রসাধন নয়, এটি যেন উৎসবের এক পশলা বৃষ্টি যা মনকে সজীব করে তোলে। যুগে যুগে এই প্রথাটি আমাদের ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইতিহাসের পাতা থেকে বর্তমানের সাজ
মেহেদির ব্যবহার বহু প্রাচীন। মিশরীয় মমি থেকে শুরু করে মুঘল রাজদরবার— সর্বত্রই এর জয়জয়কার ছিল। তবে আধুনিক সময়ে এর রূপ বদলেছে। এক সময় কেবল আঙুলের ডগায় গোল করে মেহেদি লাগানো হতো, যাকে বলা হতো ‘চাঁদ-তারা’ নকশা। বর্তমানে সেই জায়গা দখল করেছে সূক্ষ্ম অ্যারাবিক প্যাটার্ন, ফ্লোরাল ডিজাইন কিংবা রাজস্থানি ভরাট কাজ। তবে নকশা যাই হোক না কেন, সেই চিরাচরিত মেটে ঘ্রাণ আজও আমাদের শৈশবের ঈদের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।
নকশার বৈচিত্র্য ও সমকালীন ট্রেন্ড
বর্তমান সময়ে মেহেদির নকশায় এসেছে ফিউশন। তরুণীরা এখন হাতের কবজি থেকে কনুই পর্যন্ত ভরাট নকশার চেয়ে বরং হাতের তালুর মাঝখানে হালকা কাজ এবং আঙুলের ওপর জ্যামিতিক নকশা বেশি পছন্দ করছেন। একে বলা হয় ‘মিনিমালিস্টিক ডিজাইন’। আবার অনেকে হাতের ওপরের অংশে গয়নার মতো করে ‘জুয়েলারি কাট’ নকশা করেন, যা দেখতে অনেকটা হাতের চুড়ি বা আংটির মতো লাগে। এই বৈচিত্র্যই ঈদের সাজে নিয়ে আসে আধুনিকতার ছোঁয়া।
রঙ গাঢ় করার কিছু ঘরোয়া কৌশল
মেহেদির আসল সার্থকতা এর গাঢ় রঙে। রঙ দীর্ঘস্থায়ী ও টকটকে লাল করতে কিছু প্রাচীন টোটকা আজও কার্যকর। মেহেদি শুকিয়ে যাওয়ার পর তা পানি দিয়ে না ধুয়ে তেল বা ভোঁতা ছুরি দিয়ে ঘষে তোলা উচিত। এরপর চিনি ও লেবুর রসের মিশ্রণ তুলা দিয়ে হালকা করে নকশার ওপর লাগালে রঙ অনেকক্ষণ স্থায়ী হয়। অনেকে আবার লবঙ্গের ধোঁয়াও ব্যবহার করেন, যা রঙকে খয়েরি আভা দিতে সাহায্য করে। অন্তত ৫-৬ ঘণ্টা পানি থেকে হাত দূরে রাখলে মেহেদির রঙ পূর্ণ বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়।
সতর্কতা ও প্রাকৃতিক মেহেদির গুণ
বাজারচলতি ‘ইনস্ট্যান্ট’ বা কেমিক্যালযুক্ত মেহেদি ব্যবহারে কিছুটা সতর্কতা প্রয়োজন। ঝটপট রঙ আসার লোভে অনেকেই ক্ষতিকারক রাসায়নিকযুক্ত টিউব বেছে নেন, যা ত্বকের অ্যালার্জি বা র্যাশের কারণ হতে পারে। উৎসবের আনন্দ যাতে নিরানন্দে পরিণত না হয়, সেজন্য ভালো মানের অর্গানিক মেহেদি ব্যবহার করাই বুদ্ধিমানের কাজ। মনে রাখবেন, প্রাকৃতিক মেহেদির রঙ যেমন স্নিগ্ধ, এর ওষধি গুণাগুণও তেমনি ত্বকের জন্য উপকারী।
শেষ কথা: বন্ধনের নাম মেহেদি
ঈদের মেহেদি আসলে কেবল সুন্দর দেখানোর জন্য নয়, এটি আত্মীয়তা ও বন্ধুত্বের বন্ধন দৃঢ় করার একটি উপলক্ষ। চাঁদরাতে যখন মা তার মেয়ের হাতে পরম মমতায় নকশা করে দেন, কিংবা বান্ধবীরা মিলে একে অপরের হাত সাজিয়ে তোলে, তখন সেই মুহূর্তগুলোই হয়ে ওঠে ঈদের শ্রেষ্ঠ উপহার। হাতের সেই লাল রঙ মুছে গেলেও হৃদয়ে থেকে যায় উৎসবের সেই অমলিন পরশ।