ভালোবাসার অলিগলি নিয়ে আমাদের জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। কখনো তা পেটের ভেতর প্রজাপতির ডানা ঝাপটানো, কখনো আবার নির্ঘুম রাতের কাব্য। কিন্তু এই অনুভূতির আড়ালে আমাদের মগজের ভেতর যে আলোকসজ্জা চলে, তার খবর রাখি কজন? আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, ভালোবাসা কেবল হৃদয়ের ব্যাপার নয়, বরং এটি মস্তিষ্কের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আলো জ্বালিয়ে দেওয়ার এক জাদুকরী প্রক্রিয়া।
বাটারফ্লাইজ ইন স্টম্যাক
প্রিয় মানুষটিকে সামনে দেখলে কিংবা তার কথা ভাবলে পেটের ভেতর কেমন একটা শিরশিরে অনুভূতি হয় না? ইংরেজিতে একেই বলে ‘বাটারফ্লাইজ ইন স্টম্যাক’। ভয়, লজ্জা আর আনন্দের এক অদ্ভুত মিশ্রণে পেটের ভেতর যেন এক পশলা ঝড় বয়ে যায়। তবে পেটের এই কারসাজি যতটা সহজ, মাথার ভেতরের খেলাটা তার চেয়েও অনেক বেশি জটিল। ফিনল্যান্ডের একদল গবেষক সম্প্রতি প্রমাণ করেছেন যে, আমাদের মস্তিষ্কের যে অংশগুলো সাধারণত অন্ধকার বা নিস্তেজ থাকে, ভালোবাসার পরশে সেগুলো টুনিল্যাম্পের মতো জ্বলে উঠতে পারে।
মস্তিষ্কের মানচিত্রে ভালোবাসার টুনি বাল্ব
আমরা যখন কাউকে ভালোবাসি, তখন আমাদের মস্তিষ্কে এক ধরনের জটিল বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক তরঙ্গ প্রবাহিত হয়। ‘সেরিব্রাল কর্টেক্স’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ভালোবাসার মানুষের উপস্থিতি বা চিন্তা আমাদের মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলকে দারুণভাবে উদ্দীপ্ত করে। গবেষকরা ‘ফাংশনাল ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং’ বা এফএমআরআই প্রযুক্তির সাহায্যে দেখেছেন, ভালোবাসার ভিন্নতায় মস্তিষ্কের ভিন্ন ভিন্ন অংশ আলোকিত হয়ে ওঠে। ঠিক যেন অন্ধকার ঘরে হঠাৎ করে কেউ একের পর এক রঙিন বাতি জ্বালিয়ে দিচ্ছে!
ভালোবাসার রঙ যখন ভিন্ন ভিন্ন
ভালোবাসা মানেই কি কেবল রক্তমাংসের মানুষের প্রতি টান? একদমই নয়। এই গবেষণায় উঠে এসেছে এক চমৎকার তথ্য। সন্তানের প্রতি মা-বাবার মমতা, পোষ্য প্রাণীর প্রতি মায়া, কিংবা প্রকৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ সবই ভালোবাসার একেকটি রূপ। এমনকি স্রষ্টার প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও ভালোবাসাও মস্তিষ্কে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। মজার ব্যাপার হলো, একেক ধরনের ভালোবাসায় মস্তিষ্কের একেকটি অঞ্চল চকচক করে ওঠে। সন্তানের জন্য অনুভব করা টান আর জীবনসঙ্গীর প্রতি রোমান্টিক প্রেমের সংকেত মস্তিষ্কের আলাদা আলাদা প্রকোষ্ঠে ধরা পড়ে।
পরিস্থিতি যখন নিয়ন্ত্রক
গবেষণা প্রধান পার্টিলি রিনির মতে, আমাদের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ঠিক করে দেয় ভালোবাসার তীব্রতা কতটুকু হবে। আমরা যখন বাস্তবে কারো সান্নিধ্যে থাকি, তখন মস্তিষ্কের যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়, কল্পনার জগতে বিচরণ করার সময় সেই তীব্রতা কিছুটা ভিন্ন হয়। অর্থাৎ বাস্তব আর কল্পনার ভালোবাসার মধ্যেও মস্তিষ্ক নিজের মতো করে পার্থক্য গড়ে নেয়। তাই বলা যায়, আপনার অনুভূতির ধরন যেমনই হোক না কেন, মস্তিষ্ক তা ঠিকই চিনে নেয় এবং সেই অনুযায়ী নিজের ভেতর উৎসবের আলো জ্বালিয়ে দেয়।
ভালোবাসা আসলে এক মহৌষধ, যা আমাদের স্নায়ুকে সজীব রাখে এবং অন্ধকার মনকে করে তোলে আলোকময়। তাই জীবনকে উপভোগ করতে আর মাথার ভেতর সেই রঙিন বাতিগুলো জ্বালিয়ে রাখতে ভালোবাসার কোনো বিকল্প নেই।