ঈদের আমেজ মানেই খাবারের টেবিলে বাহারি মিষ্টি, পোলাও আর মাংসের উৎসব। উৎসবের দিনগুলোতে ডায়েটের নিয়মকানুন শিকেয় তুলে রসনা বিলাসে মাতেননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দায়। কিন্তু ছুটির আনন্দ শেষ হতেই ডায়াবেটিস রোগীদের কপালে ভাঁজ ফেলছে গ্লুকোমিটারের রিডিং। ঈদের অনিয়মের জেরে অনেকেরই রক্তে সুগারের মাত্রা এখন লাগামছাড়া।
আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ায় ডায়াবেটিসের প্রকোপে পাকিস্তানের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। দেশে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ মানুষ এই সাইলেন্ট কিলারের শিকার। তবে আশার কথা হলো, আমাদের দেশে সিংহভাগ রোগীই ‘টাইপ-২’ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত, যা শুধু ওষুধে নয়, লাইফস্টাইল বা জীবনযাত্রায় একটু লাগাম টানলেই বশে রাখা যায়।
ঈদের অনিয়ম কাটিয়ে শরীরকে আবার ট্র্যাকে ফেরাতে মেনে চলুন কিছু সহজ কৌশল…
খাবারের নিয়ন্ত্রণ ও পুষ্টি
ঘড়ির কাঁটা মেনে আহার: ঈদের ক’দিন খাওয়ার সময়ের কোনো ঠিকঠিকানা ছিল না। এবার আগের নিয়মে ফিরুন। সময়মতো খাওয়ার পাশাপাশি পরিমাণের দিকে নজর দিন। আটার রুটি খাচ্ছেন মানেই যে ইচ্ছেমতো খাওয়া যাবে, তা কিন্তু নয়। অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট শর্করা বাড়াবেই।
আলুকে সবজি ভাবার ভুল নয়: আলুকে অনেকেই ভাতের বিকল্প তরকারি ভাবেন। মনে রাখবেন, এটি উচ্চ শর্করা বা স্টার্চযুক্ত খাবার। তাই পাতে যদি আলু থাকে, তবে সেই অনুপাতে ভাত বা রুটি কমিয়ে ব্যালেন্স করুন।
লাল চাল ও ভুসিযুক্ত আটা: রিফাইন করা সাদা চাল বা ময়দা রক্তে চিনি দ্রুত বাড়ায়। এর বদলে লাল চালের ভাত, লাল আটার রুটি বা ওটস খান। এগুলোর ফাইবার (আঁশ) রক্তে চিনি শোষণের গতি ধীর করে।
ফাস্টফুড ও চর্বিকে বিদায়: ঈদের ক’দিন এমনিতেই প্রচুর রেড মিট খাওয়া হয়েছে। এবার কড়া তেল-চর্বি, অতিরিক্ত লবণ, কোমল পানীয় ও প্রক্রিয়াজাত খাবার খাদ্যতালিকা থেকে পুরোপুরি বাদ দিন। পানির কোনো বিকল্প নেই।
সক্রিয় জীবনযাপন ও শরীরচর্চা
স্বাস্থ্যকর নাশতা নির্বাচন: কাজের ফাঁকে ক্ষুধা লাগলে ভাজাপোড়া বা বিস্কুট না খেয়ে শসা, খিরা বা অল্প টক দই খান। টিভি দেখতে দেখতে মুখ চালানোর অভ্যাস আজই ছাড়ুন। শসা পেট ভরা রাখে, অথচ সুগার বাড়ায় না।
টানা বসে থাকার অলসতা দূর: ডেস্কে একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকবেন না। প্রতি আধঘণ্টা পর একটু উঠে দাঁড়ান, অফিস রুমে পায়চারি করুন। সুযোগ থাকলে লিফট এড়িয়ে সিঁড়ি ব্যবহার করুন।
দৈনিক ঘাম ঝরানো: শরীরচর্চার কোনো বিকল্প নেই। প্রতিদিন নিয়ম করে অন্তত ৩০ মিনিট জোরে হাঁটুন বা ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ করুন। এটি ইনসুলিনের কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
সতর্কতা ও চিকিৎসকের পরামর্শ
ধূমপান ও ওজনকে ‘না’: ডায়াবেটিস থাকলে ধূমপান করা আত্মঘাতী। এটি সরাসরি হার্ট ও কিডনি বিকল করে দেয়। তাই ধূমপান বর্জন করে বডি মাস ইনডেক্স (BMI) অনুযায়ী আদর্শ ওজন ধরে রাখুন।
নিয়মিত মেডিকেল স্ক্রিনিং: ঈদের পর অন্তত একবার ব্লাড সুগার ও প্রেসার মাপুন। মাত্রা বেশি থাকলে নিজে নিজে ওষুধ না বাড়িয়ে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের (এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট) শরণাপন্ন হন।
সামাজিক দাওয়াতে সংযম: আত্মীয়ের বাড়ি বা কোনো দাওয়াতে গেলে অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার বিনয়ের সাথে এড়িয়ে চলুন। নিজের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার দায়িত্ব একান্তই আপনার।
ঈদের ছুটির অনিয়ম ঝেড়ে ফেলে আজই ফিরুন সুশৃঙ্খল রুটিনে। আপনার একটু সচেতনতাই এনে দিতে পারে নিরোগ ও দীর্ঘ জীবন।