চৈত্রের খরতাপ শেষে যখন বৈশাখের নতুন সূর্য উঁকি দেয়, তখন বাংলার প্রকৃতি সেজে ওঠে নতুন সাজে। এই বৈশাখ কেবল সমতলের বাঙালির নয়, বরং পাহাড় ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের কাছেও এক মহোৎসব। বিশেষ করে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের কাছে এই সময়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও ‘বিজু’ উৎসবটি মূলত চাকমা সম্প্রদায়ের প্রধান উৎসব, কিন্তু বর্তমানে সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের ফলে সাঁওতালদের বৈশাখী আয়োজনেও এক ধরনের উৎসবমুখর সংহতি দেখা যায়। পহেলা বৈশাখের এই বিশেষ দিনে সাঁওতালি তরুণ-তরুণীদের পোশাকের স্টাইল এবং সাজগোজ যেন লাল-সাদা ঐতিহ্যের সাথে আধুনিক ফ্যাশনের এক চমৎকার ফিউশন তৈরি করে। তাদের এই এথনিক লুক পহেলা বৈশাখের ভিড়ে সবসময়ই আলাদাভাবে নজর কেড়ে নেয়।
পাঞ্চি-ফতায় লাল-সাদার ধ্রুপদী আভিজাত্য
সাঁওতালি নারীদের বৈশাখী সাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো তাদের চিরাচরিত ‘পাঞ্চি-ফতা’। পহেলা বৈশাখের সাথে লাল-সাদা রঙের যে এক নিবিড় সম্পর্ক, তা সাঁওতালি পোশাকে সব সময়ই বিদ্যমান। তবে এই বিশেষ দিনে তারা সাধারণত গাঢ় লাল পাড়ের ধবধবে সাদা সুতির শাড়ি বা পাঞ্চি বেছে নেন। হাতের বুননে তৈরি এই মোটা সুতোর কাপড়গুলো একদিকে যেমন আরামদায়ক, অন্যদিকে এর স্থায়িত্ব ও আভিজাত্য অতুলনীয়। বিশেষ করে কোমরে জড়িয়ে পরার ভঙ্গি এবং কাঁধের ওপর দিয়ে ফতা বা চাদরটি টেনে নেওয়ার ধরনটি তাদের এক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দান করে। এই পোশাকে কোনো কৃত্রিম চাকচিক্য নেই, বরং আছে মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা।
মাথার খোঁপা ও বুনো ফুলের মায়াবী সাজ
পহেলা বৈশাখের সকালে সাঁওতাল নারীদের সাজের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো তাদের চুলের বিন্যাস। তারা সাধারণত বড় করে খোঁপা করেন এবং সেই খোঁপাকে ঘিরে থাকে তাজা বুনো ফুলের বাহার। বৈশাখী মেলা বা উৎসবের দিনে তারা খোঁপায় গোঁজেন সর্ষে ফুল, পলাশ কিংবা চন্দ্রমল্লিকা। অনেকে আবার সাদা শাড়ির সাথে মিলিয়ে রূপার কাঁটা বা ঝুমকা দিয়েও চুল সাজান। কপালে বড় একটি লাল টিপ আর চোখে টানা কাজল— এই চিরচেনা সাজই তাদের পহেলা বৈশাখের মূল আকর্ষণ। প্রকৃতির দান করা উপকরণ দিয়ে নিজেদের সাজিয়ে তোলার এই প্রবণতা তাদের আভিজাত্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
রুপার গয়না ও লোকজ অলঙ্কার
সাঁওতালি লাইফস্টাইলে গয়নার গুরুত্ব অপরিসীম। বৈশাখের উৎসবে তারা সাধারণত রুপা বা সাদা ধাতুর তৈরি ভারী গয়না পরতে পছন্দ করেন। গলার হাসুলি, হাতের মোটা বালা এবং কানে বড় ঝুমকা তাদের পোশাকে এক পূর্ণতা নিয়ে আসে। সাঁওতালি অলঙ্কারগুলো বেশিরভাগই জ্যামিতিক নকশার এবং প্রকৃতির বিভিন্ন মোটিফ দ্বারা অনুপ্রাণিত। সমতলের বাঙালি নারীরাও এখন পহেলা বৈশাখে সাঁওতালি ঘরানার এই রুপার গয়নাগুলো আপন করে নিয়েছেন। এই গয়নাগুলো কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং এগুলো তাদের সাহস এবং শক্তির প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হয়।
পুরুষদের পোশাকে ঐতিহ্যের ছোঁয়া
সাঁওতাল পুরুষরাও পহেলা বৈশাখের দিন পোশাকের ব্যাপারে পিছিয়ে থাকেন না। তারা সাধারণত সাদা রঙের ধুতি বা লুঙ্গির সাথে লাল পাড়ের গামছা ব্যবহার করেন। তবে উৎসবের বিশেষ আমেজে আধুনিক সাঁওতাল তরুণেরা এখন পাঞ্জাবি বা ফতুয়াও পরছেন, যাতে থাকে সাঁওতালি বুনন শৈলীর বিশেষ নকশা। কাঁধে একটি গামছা ঝুলিয়ে রাখা তাদের চিরায়ত স্টাইল। পুরুষদের পোশাকে এই সাধারণ অথচ দৃপ্ত ভঙ্গিটি উৎসবের আনন্দকে আরও দ্বিগুণ করে তোলে। ঢাকের তালে আর মাদলের রোলে যখন তারা উৎসবে মেতে ওঠেন, তখন তাদের পোশাকের এই সরলতা প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে যায়।
সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন ও ফ্যাশন ট্রেন্ড
পহেলা বৈশাখ আজ আর নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সাঁওতালি পোশাকের এই স্টাইল এখন মূলধারার ফ্যাশনেও প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশের বড় বড় ফ্যাশন হাউসগুলো এখন সাঁওতালি ‘পাঞ্চি’ মোটিফ ব্যবহার করে বৈশাখী কালেকশন তৈরি করছে। পহেলা বৈশাখের সকালে যখন সমতলের তরুণীরা সাঁওতালি ঢঙে শাড়ি পরে রমনার বটমূলে বা চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেন, তখন সেটি এক অনন্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা দেয়। এই পোশাক শৈলী আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শেকড়ের টান আর প্রকৃতির ছোঁয়া থাকলেই যে কোনো সাজ হয়ে উঠতে পারে কালজয়ী ও আধুনিক।