Thursday 15 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

শারদীয় আবাহনে মাঙ্গলিক সামগ্রীর কেনাকাটা

ফারহানা নীলা
১৫ অক্টোবর ২০২৬ ১৬:৩৭

শারদীয় দুর্গোৎসবের ঢাকের বাদ্যি বাজলেই প্রতিটি বাঙালি গৃহস্থালিতে এক অপূর্ব আধ্যাত্মিক স্পন্দন সঞ্চারিত হয়। বছরের এই একটি মাত্র সময়ের জন্য পরম আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকে পুরো পরিবার। তবে দুর্গাপূজার আগের কেনাকাটা মানেই কেবল শপিং মল ঘুরে নিজের জন্য নতুন জামাকাপড় কেনার গল্প নয়। এর আড়ালের সবচেয়ে আকর্ষক দিক হলো আবহমান সনাতন সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত কিছু শুভ ও মাঙ্গলিক সামগ্রীর সংগ্রহ, যা ছাড়া উৎসবের পূর্ণতাই যেন অপূর্ণ থেকে যায়। দেবীর মর্ত্যে আগমনকে স্মরণীয় করে তুলতে এবং ঘরের পরিবেশকে পরম পবিত্রতায় ভরিয়ে তুলতে পারিবারিক ঐতিহ্য মেনে কেনা হয় নানা আচারের অনুষঙ্গ। এই প্রয়োজনীয় উপকরণগুলো কোথায় পাওয়া যায় এবং কেমন দামে মিলতে পারে, তা নিয়ে রইল এক বিস্তারিত ধারণা।

বিজ্ঞাপন

শাঁখা-পলা ও মাঙ্গলিক অলংকারের চিরায়ত রূপ এবং দরদাম

বাঙালি সনাতন ঐতিহ্যে শাঁখা, পলা এবং লোহার নোয়া কেবল সাধারণ কোনো অলংকার নয়, বরং এটি বিবাহিত জীবনের মাঙ্গলিকতা ও সৌভাগ্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতীক। শারদীয় পুজোর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে ঘরের বধূ বা নারীদের জন্য নতুন শাঁখা ও পলা কেনা অত্যন্ত শুভ বলে গণ্য করা হয়। কারিগরদের নিখুঁত হাতে খোদাই করা নতুন নকশার শাঁখা কিংবা প্রবাল রঙের লাল পলা পরিধান করে পুজো মণ্ডপে যাওয়ার আনন্দই আলাদা। অনেকেই আবার উৎসবের এই বিশেষ মরসুমকে স্মৃতিময় করে রাখতে শাঁখা ও পলা সোনা দিয়ে বাঁধিয়ে নেন কিংবা খাঁটি সোনা ও রূপার প্রলেপ দেওয়া নোয়া কেনাকাটার তালিকাভুক্ত করেন। প্রাচীন প্রথা আর আধুনিক নকশার এই অপূর্ব মেলবন্ধন প্রতিটি পরিবারে এক পরম আনন্দের রূপ নিয়ে আসে। এই ধরনের ঐতিহ্যবাহী শাঁখা-পলা কেনার জন্য ঢাকার শাঁখারী বাজার, তাঁতিবাজার, পুরান ঢাকার বিভিন্ন প্রাচীন বাজার কিংবা বড় বড় শপিং মলের জুয়েলারি বা গোল্ডস্মিথ শপগুলোতে চমৎকার সব কালেকশন পাওয়া যায়। সাধারণ শাঁখার জোড়া মানভেদে ৩০০ টাকা থেকে ১,৫০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়, আর সোনা বাঁধানো বা প্রিমিয়াম ডিজাইনের ক্ষেত্রে দাম ডিজাইন ও স্বর্ণের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে ৩,০০০ টাকা থেকে শুরু করে ১৫,০০০ টাকা বা তার বেশি হতে পারে।

সিঁদুরের রাঙা ছোঁয়া ও আলতা-চুড়ির কাঁচের ঝঙ্কার

উৎসবের দিনগুলোতে নিজেদের প্রসাধন আর আচারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে খাঁটি সিঁদুর এবং রক্তিম আলতা। মহাঅষ্টমীর সকালে দেবীর পাদপদ্মে অঞ্জলি দেওয়া থেকে শুরু করে বিজয়া দশমীর দিন দেবী বরণ ও পরম আনন্দের সিঁদুর খেলা—সবকিছুর মূল কেন্দ্রে থাকে এই রক্তিম সিঁদুর। সিঁদুরের পাশাপাশি পুজোর দিনগুলোতে আলতা-রাঙা হাত ও পায়ের ঐতিহ্যময় দৃশ্য প্রতিটি ঘরকে অপরূপ এক রূপ দান করে। বিশেষ করে লাল, সাদা কিংবা গাঢ় সবুজ রঙের কাঁচের চুড়ির মিষ্টি শব্দে মণ্ডপ থেকে শুরু করে ঘরের প্রতিটি কোণ মুখরিত হয়ে ওঠে। এই ছোট্ট ছোট প্রসাধন সামগ্রীগুলো কেবল নারীদের সৌন্দর্য বাড়ায় না, বরং সনাতন উৎসবের চিরায়ত রূপটিকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঁচিয়ে রাখে। এই সামগ্রীগুলো দেশের প্রায় প্রতিটি স্থানীয় কসমেটিকসের দোকান, নিউ মার্কেট, গাউসিয়া মার্কেট, কিংবা যেকোনো বড় পুজোর মণ্ডপের পাশের অস্থায়ী স্টলগুলোতে সহজে পাওয়া যায়। খাঁটি সিঁদুরের কৌটো বা প্যাকেট সাধারণত ৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়, ভালো মানের আলতার কৌটো ৩০ থেকে ১০০ টাকা, আর এক ডজন কাঁচের বা মেটালের রকমারি চুড়ি ৬০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে সহজেই সংগ্রহ করা যায়।

প্রদীপের আলো ও সুগন্ধি ধূপের আধ্যাত্মিক আবহ

উৎসবের দিনগুলোতে ঘরবাড়ি এবং ঠাকুরঘরের পরিবেশকে দেবীর আরাধনার উপযুক্ত করে তুলতে পুজো আচারের নানা সামগ্রীর প্রয়োজন পড়ে সবচেয়ে বেশি। ধাতুশিল্পের কারুকার্যে তৈরি নতুন পিতল বা কাঁসার প্রদীপ, নৈবেদের ঘটি, ধুনুচি এবং কাসর-ঘণ্টা কেনাকাটা করা বহু পুরোনো এক পারিবারিক রেওয়াজ। এর সাথে যুক্ত হয় খাঁটি গাভীর ঘিয়ে তৈরি প্রদীপের সলতে, দেশি কর্পূর এবং নানাবিধ সুগন্ধযুক্ত ধূপকাঠি। সন্ধ্যাকালে যখন ঢাকের আওয়াজের সাথে কাঁসর-ঘণ্টা বাজে এবং ঘিয়ের প্রদীপ ও সুগন্ধি ধূপের ধোঁয়ায় পুরো ঘর সেজে ওঠে, তখন এক স্বর্গীয় ও প্রশান্তময় আবহের সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি ঘরের মেঝেকে শুভ চিহ্নে রাঙিয়ে তুলতে চালের গুঁড়ির নিখুঁত আলপনা কিংবা রকমারি স্টিকারের সংযোজন ঘরের সৌন্দর্যকে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দেয়। এই পিতল-কাঁসার বাসনপত্র এবং পুজোর সামগ্রীগুলো প্রধানত পুরান ঢাকার তাঁতিবাজার, পাটুয়াটুলী, বাটা থেকে শুরু করে বড় বড় হোম ডেকর বা পুজোর বাজারের দোকানে পাওয়া যায়। পিতলের ছোট প্রদীপ বা ধুনুচি ২০০ টাকা থেকে ১,০০০ টাকা, কাঁসার কাসর-ঘণ্টা ৫০০ টাকা থেকে ২,৫০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়া সুগন্ধি ধূপকাঠি ও কর্পূর প্রতিটি স্থানীয় মুদি বা দশমহাবিদ্যা সামগ্রীর দোকানে ২০ টাকা থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে এবং রেডিমেড আলপনা স্টিকার বা চালের গুঁড়ি ৫০ থেকে ২০০ টাকার বাজেটের মধ্যে পাওয়া সম্ভব।

আলপনার নান্দনিক স্পর্শ

চালের গুঁড়ার ঐতিহ্য থেকে আধুনিক রেডিমেড স্টিকারের জাদু…

উৎসবের মরসুমে গৃহসজ্জার সবচেয়ে চোখ ধাঁধানো এবং ঐতিহ্যবাহী অনুষঙ্গ হলো আলপনা। প্রাচীনকাল থেকেই লক্ষ্মীপুজো কিংবা দুর্গোৎসভে চালের গুঁড়ি বা চালের পিঠালি ভিজিয়ে বাটার পর কাঁচা হাতে ঘরের মেঝে ও প্রবেশদ্বারে আলপনা আঁকার প্রথা চলে আসছে। চালের গুঁড়ির সাদা রঙের সাথে সামান্য সিঁদুর বা হলুদ মিশিয়ে যে লতাপাতা, ধানছড়া, এবং দেবী লক্ষ্মীর পদচিহ্নের নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়, তা কেবল গৃহের শোভা বাড়ায় না, বরং শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী ঘরে ধন-ধান্য ও সমৃদ্ধি টেনে আনে। তবে আজকের ব্যস্ত নাগরিক জীবনে অনেকের পক্ষেই চাল বেটে ধীরেসুস্থে মেঝেময় আলপনা আঁকা সম্ভব হয়ে ওঠে না। এই আধুনিক চাহিদার কথা মাথায় রেখে বাজারে এখন পাওয়া যাচ্ছে অত্যন্ত নান্দনিক ও রকমারি রেডিমেড আলপনা স্টিকার। ওয়াটারপ্রুফ এবং সহজেই মেঝেতে লাগিয়ে নেওয়া যায় এমন স্টিকারগুলো খুব অল্প সময়েই ঘরকে উৎসবের আমেজে ভরিয়ে তোলে। ঐতিহ্যকে ভালোবেসে আজও যারা চালের গুঁড়িতেই আস্থা রাখেন কিংবা সময়ের অভাবে সুন্দর স্টিকার বেছে নেন—উভয় মাধ্যমই ঘরের আবহে এনে দেয় পরম শুভ বার্তা ও উৎসবের নিজস্ব রূপ।

ঐতিহ্যের আলোয় উৎসবের পূর্ণতা

শারদীয় দুর্গোৎসব কেবল কয়েকটি দিনের আনন্দ কিংবা বাহ্যিক আড়ম্বরের নাম নয়; এটি আমাদের শিকড়, সংস্কৃতি এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের সাথে মিশে থাকা এক গভীর আত্মিক অনুভূতির নাম। নতুন শাঁখা-পলার শুভ ধ্বনি, সিঁদুরের রক্তিম আভা, প্রদীপের স্নিগ্ধ আলো আর ধূপ-ধুনোর পবিত্র সুবাস আমাদের ঘরবাড়িকে কেবল সৌন্দর্যই দেয় না, বরং মনকে করে তোলে শান্ত ও আনন্দমুখর। ব্যস্ত আধুনিকতার ভিড়ে এই প্রাচীন আচার ও মাঙ্গলিক সামগ্রীগুলোর কেনাকাটা আমাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে টিকিয়ে রাখে শেকড়ের টান। প্রতিটি গৃহস্থালিতে এই ছোট ছোট প্রস্তুতি ও আয়োজনের হাত ধরেই শারদীয় উৎসব হয়ে ওঠে সর্বাঙ্গীন সুন্দর, অর্থবহ ও চিরস্মরণীয়।

সারাবাংলা/এফএন/এএসজি
বিজ্ঞাপন

সীমান্তে এ এক নীরব আত্মত্যাগ
১৫ অক্টোবর ২০২৬ ১৮:২৪

আরো

ফারহানা নীলা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর