ঢাকা: অমর একুশে বইমেলা-২০২৬ এর শুরুটা ছিল কিছুটা ধীরগতির। প্রথম কয়েক দিনে তুলনামূলক কম ছিল পাঠক-দর্শনার্থীদের উপস্থিতি। তবে নবম দিনে এসে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সকাল থেকেই বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে বইপ্রেমীদের সরব উপস্থিতিতে যেন আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে বইমেলা। বিশেষ করে ‘শিশুপ্রহর’ ঘিরে শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বসিত পদচারণায় সকাল থেকেই মুখর হয়ে ওঠে মেলা প্রাঙ্গণ।
শুক্রবার (৬ মার্চ) সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় সকাল ১১টায় দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয় মেলার প্রবেশদ্বার। একই সময় শুরু হয় শিশুদের জন্য বিশেষ আয়োজন ‘শিশুপ্রহর’, যা চলে দুপুর ১টা পর্যন্ত। শিশুপ্রহর ঘিরে মেলায় ছিল ছোট্ট পাঠকদের উচ্ছ্বাসমুখর উপস্থিতি। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরাও এই আয়োজনে অংশ নেয়।
শিশুপ্রহরের অন্যতম আকর্ষণ ছিল পাপেট শো। মঞ্চের সামনে পাটি বিছিয়ে সারি বেঁধে বসে পড়ে শিশুরা, যেন কখন শুরু হবে তাদের প্রিয় পুতুলের গল্প। পাপেটের নানা চরিত্রের কথোপকথন, গল্প বলা ও মজার অঙ্গভঙ্গি শিশুদের দারুণভাবে মুগ্ধ করে। পাশাপাশি পুতুলনাচ, হ্যান্ড পাপেট ও বায়োস্কোপ ঘিরেও তৈরি হয় আলাদা আকর্ষণ। শিশু চত্বরে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক আয়োজনও ছিল।

শিশুপ্রহরের অন্যতম আকর্ষণ ছিল পাপেট শো।
আয়োজকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিনই বিনামূল্যে কয়েক দফায় পাপেট শো, পুতুলনাচ ও গল্পপাঠের আসর বসছে। পাশাপাশি শিশুদের জন্য রয়েছে বায়োস্কোপ দেখা ও পুতুল তৈরির ছোট কর্মশালা।
শিশুপ্রহরে এসে দারুণ আনন্দিত ছোট্ট দর্শনার্থী আরাফাত। মায়ের সঙ্গে মেলায় ঘুরতে এসে পাপেট শো দেখে তার উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি আগে শুধু টিভিতে পুতুল নাচ দেখেছি। এখানে এসে সামনে থেকে পাপেট শো দেখতে খুব ভালো লাগছে। পুতুলগুলো যখন কথা বলে আর নড়াচড়া করে, তখন মনে হয় তারা সত্যিই জীবিত।’
মেলায় এসে গল্পের বই, কমিকস ও ছবির বই ঘিরেও ছিল শিশুদের আগ্রহ। অনেক ক্ষুদে পাঠক নিজেদের পছন্দের বই সংগ্রহ করতে স্টলে স্টলে ঘুরে বেড়ায়।
অভিভাবকরাও শিশুদের বইমেলায় নিয়ে আসাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। মোহাম্মদপুর থেকে ছেলেকে নিয়ে আসা রুবেল আহমেদ বলেন, ‘বর্তমানে শিশুরা আউটডোর গেমের চেয়ে মোবাইলেই বেশি সময় কাটায়। প্রযুক্তির ইতিবাচক দিক থাকলেও এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শিশুদের বাইরের জগত ও বইয়ের সঙ্গে পরিচয় করানো জরুরি।’
এদিকে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মেলায় বাড়তে থাকে পাঠক-দর্শনার্থীর ভিড়। ইফতারের আগে কিছুটা ফাঁকা থাকলেও ইফতারের পর আবারও মেলায় দর্শনার্থীদের সরব উপস্থিতি দেখা যায়।
প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রেতারাও জানিয়েছেন, ছুটির দিনে বেচাকেনা তুলনামূলক ভালো হয়েছে। মাওলা ব্রাদার্সের বিক্রয়কর্মী তুশার আহমেদ বলেন, ‘অন্যান্য দিনের তুলনায় আজকে পাঠক-দর্শকের উপস্থিতি বেশি এবং বেচাকেনাও মোটামুটি ভালো হচ্ছে। শনিবার ছুটির দিনেও মানুষের উপস্থিতি থাকবে বলে আশা করছি।’

শিশু চত্বরে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা
তাকধুম প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মী রাকিব হাসান বলেন, ‘আজকে আমাদের বেচাকেনা ভালো। আমরা ব্যবসায়ীরা শুক্র ও শনিবার এই দুই দিনে সর্বোচ্চ বিক্রির আশা করছি, কারণ আগামী সপ্তাহে ঈদের আমেজ শুরু হয়ে যাবে এবং মেলাও শেষের দিকে যাবে।’
এদিকে সকাল ১০টায় বাংলা একাডেমির সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সভাগৃহে অমর একুশে শিশু-কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে ক, খ ও গ; এই তিন শাখায় মোট ৩০ জন প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করে। বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন নাসিম আহমেদ, টিটো মুনশী ও অনন্যা লাবণী পুতুল।
বিকেল ৩টায় বইমেলার মূলমঞ্চে জন্মশতবর্ষ: কলিম শরাফী শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অণিমা রায়। আলোচনায় অংশ নেন সাইম রানা এবং সভাপতিত্ব করেন সাধন ঘোষ। ‘লেখক বলছি’ অনুষ্ঠানে নিজেদের বই নিয়ে আলোচনা করেন মৃদুল মাহবুব ও এহসান মাহমুদ।
বিকেল ৪টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন শাহীন রেজা। আবৃত্তি পরিবেশন করেন শওকত আলী, রবিউল মাশরাফী, রূপশ্রী চক্রবর্তী ও মোহাম্মদ কামাল হোসেন। সংগীত পরিবেশন করেন মহাদেব চন্দ্র ঘোষ, মো. হারুনুর রশিদ, সঞ্চিতা রাখি, মো. রমজান হোসেন, শিরিন জাহান, রতন কুমার সাহা ও নূরতাজ পারভীন।
এদিকে মেলায় গতকাল নতুন বই জমা পড়েছে ১৯৯টি।
শনিবার মেলা শুরু হবে সকাল ১১টায় এবং চলবে রাত ৯টা পর্যন্ত। সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত থাকবে শিশুপ্রহর। এ ছাড়া বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে শিশুকিশোর সংগীত প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব। বিকেল ৩টায় মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে জন্মশতবর্ষ: নূরজাহান বেগম শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান এবং বিকেল ৪টায় থাকবে সাংস্কৃতিক আয়োজন।