Wednesday 07 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

জয়িতার পুড়ে যাওয়া স্বপ্ন আর অন্ধকার ঘর

সানজিদা যুথী
৭ অক্টোবর ২০২৬ ১৮:৫০

বিকেলের সোনাঝরা রোদ বারান্দার রেলিং ছুঁয়ে চিকচিক করছিল। গাছের পাতায় পাতায় নরম আলো, দূরে কোথাও পাখির মিষ্টি ডাক। বাতাসে ফুলের গন্ধ— এত পরিচিত, অথচ এতদিন যেন অচেনা ছিল জয়িতার কাছে। প্রায় ছয় মাস পর আজ সে বারান্দায় এসেছে। ধীরে ধীরে দরজার কাছে এসে দাঁড়াল জয়িতা। তারপর এক পা, দুই পা করে বারান্দায় এগিয়ে গেল। নরম রোদ এসে পড়ল তার গায়ে।কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।তার মনে হলো— পৃথিবীটা কি সত্যিই এত সুন্দর ছিল? নাকি সৌন্দর্যও মানুষের মতো—কখনো কাছে আসে, আবার কোনো এক নির্মম ঘটনায় দূরে সরে যায়?

জয়িতা খানিকক্ষণ রোদ মেখে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে ঘরে ফিরে এল। ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা চারকোনা ছবির ফ্রেমটায় মোটা ধুলোর আস্তরণ। এত ধুলো জমেছে যে ছবিটা কুয়াশার ভেতর লুকিয়ে আছে যেন। জয়িতা ফ্রেমটা হাতে তুলে নিল। আঁচলের এক কোণা দিয়ে আস্তে আস্তে ধুলো মুছতে লাগল। ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে উঠল ছবিটা।

বিজ্ঞাপন

ছবির মেয়েটা হাসছে। মিষ্টি একটা হাসি। চোখে স্বপ্ন।

কপালে চুলের ছোট্ট একটা গোছা। জয়িতা অনেকক্ষণ নিজের ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।তারপর খুব আস্তে বলল,
—আমি এত সুন্দর?

পরক্ষণেই নিজের গালে হাত ছুঁয়ে যেন আঁতকে উঠল সে।
—না! আমি সুন্দর না… আমি খুব বাজে!
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই তার হাত কাঁপতে শুরু করল।
কাঁপতে কাঁপতে ফ্রেমটা হাত থেকে পড়ে গেল।
ঝনঝন শব্দে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল কাচের টুকরো।

আর সেই শব্দের সঙ্গে সঙ্গেই ছয় মাস আগের সেই দিনটা ফিরে এল। অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছে জয়িতা।

প্রথম দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে। কী যে আনন্দ তার! সকাল থেকে কতবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছে। নতুন জামা, নতুন ব্যাগ, চুলে যত্ন করে সাজ। বুকের ভেতর তখন একরাশ স্বপ্ন—একদিন নিজের পায়ে দাঁড়াবে, ভালো চাকরি করবে, বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করবে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় বাবা বলেছিলেন,

—একা যাস না মা। রায়হান তোকে গেটে নামিয়ে দিয়ে আসবে।

ভাইয়ার বাইকে চেপে সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে রওনা হয়েছিল জয়িতা। বুকের ভেতর ছিল নতুন জীবনের উত্তেজনা।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে ঢোকার আগেই কিছু মানুষের নোংরা চোখ সেই স্বপ্নে প্রথম আঁচড় কাটল।
শহীদ মিনারের পাশে কয়েকজন ছেলে বসে আড্ডা দিচ্ছিল।

জয়িতা বাইক থেকে নামতেই তাদের অশ্লীল মন্তব্য ভেসে এল।
তার শরীর শিউরে উঠেছিল। কী অপরাধ করেছিল সে?
শুধু মেয়ে হয়ে জন্মানো?

ভাই রায়হান আর সহ্য করতে পারেনি। বোনের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বোনকে অপমানিত হতে দেখার যন্ত্রণা তাকে ছেলেগুলোর সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে ফেলেছিল। তর্ক থেকে ধাক্কাধাক্কি, তারপর হাতাহাতি। কিছুক্ষণ পর কয়েকজন শিক্ষার্থী এসে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিল। রায়হান যাওয়ার সময় বলেছিল,

—ক্লাস শেষ হলে ফোন দিস। আমি এসে নিয়ে যাব।

জয়িতা মাথা নেড়ে ক্লাসে ঢুকে পড়েছিল।

তখনও সে জানত না—সেদিনই তার জীবনের শেষ স্বাভাবিক দিন। ক্লাস শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের দিকে হাঁটছিল জয়িতা।

হঠাৎ চারটি মোটরসাইকেল প্রচণ্ড গতিতে তার পাশ দিয়ে চলে গেল। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার মুখে এসে পড়ল এক মুঠো তরল।

পরের মুহূর্তেই মনে হলো মুখে কেউ আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। জয়িতা চিৎকার করে উঠেছিল। তারপর মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল। চারপাশের পৃথিবীটা তখন মনে হয়েছে শুধু আগুন আর আগুন। যখন জ্ঞান ফিরলো তখন হাসপাতালের সাদা দেয়াল। ওষুধের গন্ধ। ব্যান্ডেজে ঢাকা মুখ। আর অসহ্য যন্ত্রণা।

প্রায় এক মাস পর বাড়ি ফিরেছিল জয়িতা। কিন্তু যে মেয়েটা একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ভবিষ্যৎ সাজাত, সে আর আয়নার সামনে দাঁড়াতে পারেনি। তার সুন্দর মুখটা এসিডে পুড়ে ক্ষতবিক্ষত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ অভিযুক্তদের পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিল— জয়িতা পরে শুনেছিল।

কিন্তু শাস্তি কি ফিরিয়ে দিতে পেরেছিল তার মুখ?
ফিরিয়ে দিতে পেরেছিল তার বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার সাহস?
ফিরিয়ে দিতে পেরেছিল সেই প্রথম দিনের স্বপ্ন?
একটি মেয়ের মুখ পুড়িয়ে দেওয়া কতটা সহজ!
কিন্তু সেই মুখের সঙ্গে পুড়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস, স্বপ্ন আর একটা পরিবারের হাসি—সেগুলো কে ফিরিয়ে দেবে? জয়িতা আর বাইরে যায় না। দিনের পর দিন অন্ধকার ঘরে বসে থাকে।

জানালার পর্দা টেনে রাখে। আয়না ঢেকে রাখে।

মানুষের চোখকে ভয় পায়। কারণ আগুনে পুড়ে যাওয়া মুখের চেয়েও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে মানুষের দৃষ্টি। মেঝেতে বসে বসে এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে সন্ধ্যা নেমে এসেছে , জয়িতা টের পায়নি। পাখিরা ঘরে ফিরছিল।সূর্য ডুবে গিয়েছিল।

ঘরটাও অন্ধকার হয়ে এসেছিল। মেঝেতে পড়ে থাকা ছবির ভাঙা কাচের টুকরোগুলোয় শেষ আলোটুকু কাঁপছিল। জয়িতা ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল।তার দু’গাল বেয়ে নেমে এল অশ্রু।

একসময় খুব আস্তে বলল, আমার কী দোষ ছিল?

কেউ উত্তর দিল না। সে আবার বলল, আমি কি মেয়ে বলেই এতটা অসহায়? নীরব ঘর। কোনো উত্তর নেই।

জয়িতা জানালার দিকে তাকাল। তার চোখে যেন আবার ভেসে উঠল সেই জায়গাটা। সেই ছেলেগুলো। সেই নোংরা হাসি।
সেই আগুন। আর একটি মেয়ের ভেঙে যাওয়া জীবন।

জয়িতা চোখ বন্ধ করল। তার বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল শেষ প্রশ্ন— আর কতদিন নারীর নিরাপত্তার বদলে শহীদ মিনার, বিশ্ববিদ্যালয় আর রাস্তাঘাট দখল করে থাকবে নারীর প্রতি হিংস্রতা? আর কত জয়িতার স্বপ্ন পুড়ে ছাই হলে আমরা বুঝব—একটি মেয়েকে নিরাপদে ঘরে ফেরার অধিকার দেওয়াও একটি সমাজের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব? আর অন্ধকার ঘরের ভেতর, ভাঙা ছবির পাশে বসে জয়িতা মনে কেবল একটাই প্রশ্ন—

একটা মেয়ের মুখ পুড়িয়ে দেওয়ার আগে, আমাদের সমাজের বিবেকটা কেন পুড়ে যায় না?

বিজ্ঞাপন

আরো

সানজিদা যুথী - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর