রংপুর: আলুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং সারের কালোবাজারি বন্ধ করে ভর্তুকি মূল্যে কৃষকের সারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার দাবিতে রংপুরে মানববন্ধন করেছেন কৃষকরা।
রোববার (৮ মার্চ) বিকেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বাংলাদেশ খেতমজুর ও কৃষক সংগঠনের রংপুর জেলা শাখা এ কর্মসূচির আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের জেলা আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন বাবলু।
মানববন্ধনে বক্তব্য দেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক আহসানুল আরেফিন তিতু, আলুচাষী এমদাদুল হক বাবু, আবুল কাশেমসহ অন্য নেতারা।
বক্তারা বলেন, বর্তমানে বাজারে আলুর দাম কেজিপ্রতি ৩-৪ টাকায় নেমে এসেছে। অথচ সার, বীজ, সেচ ও শ্রমিক মজুরি মিলিয়ে উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি ১৭-১৮ টাকা। ফলে আলুচাষীরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। রংপুর বিভাগের মাটি ও আবহাওয়া আলু চাষের জন্য উপযোগী হলেও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না।
তারা আরও বলেন, আলু পঁচনশীল হওয়ায় দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা কঠিন। কোল্ড স্টোরেজে জায়গা পেতেও কৃষকদের নানা সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। গতবছরের হিমাগারের ভাড়া বস্তাপ্রতি ২৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে এ বছর ৫৬০ টাকা করা হয়েছে। এতে সংরক্ষণ খরচ বেড়েছে, কিন্তু বাজারদর কমে যাওয়ায় কৃষকরা লোকসানের চক্রে পড়ছেন। অনেক এলাকায় আলুর পরিবর্তে তামাক চাষ বাড়ছে বলেও বক্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
সমাবেশে চলমান বোরো মৌসুমে সারের কৃত্রিম সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগও তোলা হয়। বক্তাদের দাবি, অনেক স্থানে কেজিপ্রতি সারে ৮-১০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। ডিলার ও ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে তারা অভিযোগ করেন।
এ ছাড়াও, মানববন্ধন থেকে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলো হলো:
১. আলুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারি উদ্যোগে আলু ক্রয়-বিক্রয় ও রফতানির ব্যবস্থা করা এবং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া;
২. সারের দুর্নীতি ও কালোবাজারি বন্ধ করে ভর্তুকি মূল্যে কৃষকের সারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা;
৩. আলুর কোল্ড স্টোরেজ ভাড়া কেজিপ্রতি ৮ টাকা বাতিল করে ১.৫০ টাকা নির্ধারণ করা এবং অগ্রিম বুকিংয়ের নামে বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত ১০০ টাকা আদায় বন্ধ করা;
৪. সরকারি উদ্যোগে প্রতিটি উপজেলায় বিশেষায়িত বীজ হিমাগার নির্মাণ এবং সব হিমাগারে প্রকৃত কৃষকের জন্য অন্তত ৬০ শতাংশ জায়গা বরাদ্দ নিশ্চিত করা;
৫. লাভজনক দামে আলু বিক্রি করতে না পারা কৃষকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
সমাবেশে আহসানুল আরেফিন তিতু বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পর কৃষকদের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের সক্রিয় ভূমিকার প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু আলুর দাম কমে যাওয়া, সারের মূল্যবৃদ্ধি ও কালোবাজারির ঘটনায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না।’
আলুচাষী এমদাদুল হক বাবু বলেন, ‘এক কাপ চায়ের দামের চেয়েও কম দামে আলু বিক্রি করতে হচ্ছে। উৎপাদন খরচ ১৮ টাকা হলেও বিক্রি করতে হচ্ছে ৩-৪ টাকায়। এভাবে চলতে থাকলে আলু চাষ টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।’
সমাবেশ শেষে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়। দাবি বাস্তবায়ন না হলে ভবিষ্যতে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হবে বলেও নেতারা জানান।
উল্লেখ্য, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রংপুর বিভাগে আলুর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৮ লাখ টনের বেশি। তবে বাজারদর কমে যাওয়ায় অনেক কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। একই সময় বোরো মৌসুমে ইউরিয়া, ডিএপি ও এমওপি সারের দাম ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে এবং বিভিন্ন এলাকায় সারের সংকটের অভিযোগ উঠেছে।