Wednesday 07 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

দখল-দূষণে মৃতপ্রায় রংপুরের ৩৩ নদী, কার্যকর উদ্যোগ নেই

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:১৪ | আপডেট: ৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:২০

দখল-দূষণে মৃতপ্রায় নদী

রংপুর: রংপুর জেলায় ৪৩টিরও বেশি নদী রয়েছে, কিন্তু দখল, দূষণ এবং অযত্নে এগুলোর একটিও ভালো অবস্থায় নেই। একসময় এই নদীগুলো ছিল এ অঞ্চলের মানুষের জীবিকা ও সমৃদ্ধির উৎস, কিন্তু এখন তা অভিশাপে পরিণত হয়েছে। শ্যামাসুন্দরী খালে ১৭০ জন অবৈধ দখলদার চিহ্নিত হলেও উচ্ছেদ অভিযান থমকে আছে, যা শহরের জলাবদ্ধতা সমস্যাকে আরও জটিল করছে।

রংপুর জেলায় নদ-নদীর সংখ্যা সরকারি হিসাবে ৮৪টি, যদিও বেসরকারি অনুমানে তা দুই শতাধিক ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে অন্তত ৩৩টি নদী দখল-দূষণের কবলে পড়ে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকা দিয়ে প্রবাহিত সাতটি নদী-ইছামতী, বুড়াইল, খোকসা ঘাঘট, আলাইকুমারী, ঘাঘট এবং শ্যামাসুন্দরী (কারও মতে খাল)—সবকটিই অবৈধ দখলদারদের হাতে ধ্বংসের মুখে। এই নদীগুলোতে একসময় খরস্রোতা পানির প্রবাহ ছিল, যা কৃষি, সেচ, ব্যাবসা-বাণিজ্য এবং জীবিকার মূল ভিত্তি ছিল। কিন্তু এখন দখল এবং দূষণের ফলে পানির প্রবাহ স্বাভাবিক নেই, অনেক জায়গায় নদীর অস্তিত্বই হারিয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, নগরীর পূর্ব প্রান্তে সাতমাথা যাওয়ার পথে খোকসা ঘাঘট নদী এখন খালে পরিণত হয়েছে। কোথাও কোথাও এর অস্তিত্ব মুছে গেছে। স্থানীয়রা জানান, তাদের পূর্বপুরুষদের কাছে শোনা গল্প অনুসারে, এই নদী একসময় খরস্রোতা ছিল এবং এর চারপাশে ব্যাবসা-বাণিজ্য ফুলে-ফেঁপে উঠত। কিন্তু কালের পরিক্রমায় দখলদাররা এটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। একইভাবে, সাতমাথা থেকে কিছুটা এগিয়ে মাহিগঞ্জে ইছামতী নদী এখন নদীও না, খালও না। দখল করে স্থানীয়রা এর দুই পাড়ে বসতভিটা গড়ে তুলেছে।

মাহিগঞ্জের বাসিন্দা আবিদুর রহমান বলেন, “ইছামতী নদীকে ঘিরে একসময় এখানে নদীবন্দর ছিল, কিন্তু তা অনেক আগেই হারিয়ে গেছে।”

রংপুরের বড় নদীগুলোর অবস্থাও শোচনীয়। তিস্তা, ঘাঘট, যমুনেশ্বরী, করতোয়া— এগুলোর কোনোটিরই ভালো অবস্থা নেই। জেলায় বুড়াইল নামে তিনটি নদী রয়েছে, যেগুলো দখল-দূষণে জর্জরিত। এছাড়া ছোটো আখিরা, নলেয়া, সোনামতি, কাফ্রিখাল, শালমারা, মরা তিস্তা, ঘিরনই, বুল্লাই, মানাস, বাইশাডারা, ধাইজান, খটখটিয়া প্রভৃতি নদীর অবস্থা আরও খারাপ। করতোয়া নদী দখল ও দূষণে মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে, যা স্থানীয় কৃষি ও জীববৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলেছে। মমিনপুরের খারুভাজ নদীও দখল ও দূষণের করাল গ্রাসে পড়ে অস্তিত্ব সংকটে।

শ্যামাসুন্দরী খালের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও নাজুক। সাম্প্রতিক এক জরিপে ১৭০ জন অবৈধ দখলদারকে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তাদের স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ১১ জন দখলদারের আপত্তির কারণে উচ্ছেদ অভিযান আটকে রয়েছে। এই খাল দখল-দূষণে সরু নালায় পরিণত হয়েছে এবং গৃহস্থালির বর্জ্য ফেলার স্থান হয়ে উঠেছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এই খাল রংপুর শহরের জল নিষ্কাশন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কিন্তু ভরাট হলে শহর পানিতে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়বে।

উল্লেখ্য, রংপুর অঞ্চলের মহারাজা জানকী জানকীবল্লভ সেনের স্বর্গীয় মাতা শ্রীমতী শ্যামা সুন্দরী সেন ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তার স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার জন্য এবং ম্যালেরিয়া দূর করার জন্য, ১৮৯০ সালে জানকীবল্লভ সেন রংপুর নগরীর সিও বাজার এলাকা থেকে মাহিগঞ্জ পর্যন্ত খাল খনন করেন। শ্যামা সুন্দরী খাল বাংলাদেশের রংপুর শহরে প্রবাহিত একটি কৃত্রিম খাল যা ‘রংপুরের ফুসফুস’ বলেও পরিচিত। ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ, ১০০ ফুট প্রস্থ এবং ৪০ ফুট গভীরতার এই খাল বর্তমানে এটি অবৈধ দখলের কারণে পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে বিভিন্ন বর্জ্য আর ময়লা-আবর্জনায় ভাগাড়ে পরিণত হয়ে, দিন দিন সরু ও ভরাট হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের অবহেলা, অনিয়মিত অবৈধ দখলদারি এবং ঘরোয়া-শিল্পকারখানার বর্জ্য নির্গমনের কারণে এটি এখন মশা-পোকার প্রজননকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। যা বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা, পরিবেশ দূষণ এবং রোগের বিস্তার ঘটাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্লাস্টিক বর্জ্যের জমায়েত এই সমস্যাকে আরও তীব্র করেছে, যা নগরবাসীদের জীবনযাত্রাকে যন্ত্রণাদায়ক করে তুলেছে।

নদীকে দূষণ, দখল, ও ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে এবং তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষা করতে ২০১৯ সালে হাইকোর্ট দেশের সব নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ও ‘আইনি ব্যক্তি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে নদীর অভিভাবক হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে, যাতে নদীগুলোর পক্ষে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যায়। আইনের প্রস্তাব অনুসারে, নদী দখল ও দূষণ রোধে কঠোর শাস্তিসহ ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০২০’-এর খসড়া তৈরি হয়েছে, যেখানে ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ৫ কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

তবে আইনি স্বীকৃতি থাকলেও, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, এবং কার্যকর প্রয়োগের অভাবে এই সিদ্ধান্ত পুরোপুরি বাস্তবায়িত হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান রিপন বলেন, বাংলাদেশে নদীগুলোকে আইনি ব্যক্তিত্ব প্রদান করা হয়েছে, যাতে তারা দূষণ, দখল এবং ধ্বংস থেকে মুক্ত থাকতে পারে। কিন্তু প্রয়োগের অভাবে এই আইন অকার্যকর। উজানে ভারতের বাঁধ নির্মাণ, কম বৃষ্টিপাত এবং শিল্প বর্জ্যের কারণে নদীগুলোর নাব্যতা হ্রাস পেয়েছে, যা জলাবদ্ধতা, কৃষি ক্ষতি এবং স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়াচ্ছে। সারা বাংলাদেশে ২৪ হাজার কিলোমিটার নদীপথ এখন ১৬ হাজারে নেমে এসেছে, যা কৃষি ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে নদীকে আইনি ব্যক্তিত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং এটি নদী সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, কিন্তু এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য আরও শক্তিশালী আইন ও কার্যকর প্রয়োগ প্রয়োজন।

সহযোগী অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান রিপন বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত আইন প্রয়োগ করে নদীগুলোকে রক্ষা করা, যাতে এগুলো আবার আশীর্বাদে পরিণত হয়। এখনই অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে পানির প্রবাহ স্বাভাবিক করার জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। অন্যথায় রংপুর শহরের জলাবদ্ধতা দূর হবে না এবং পরিবেশগত বিপর্যয় আরও তীব্র হবে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর