কুমিল্লা: কুমিল্লায় গত এক মাসে পুলিশের অভিযানে বিভিন্ন মামলায় ১ হাজার ৩৮২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একই সঙ্গে এ সময় বিপুল পরিমাণ মাদক ও অস্ত্র-গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।
জেলা পুলিশের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামানের নির্দেশে ডিবি পুলিশসহ জেলা পুলিশের সদস্যরা এ অভিযানগুলো পরিচালনা করেছেন।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে মাদক মামলার আসামি ১৮৫ জন, ‘ডেভিল হান্ট ফেজ–টু’ অভিযানে ৪২৬ জন, ডাকাতির ঘটনায় জড়িত ২১ জন এবং নিয়মিত মামলার ৭৫০ জন আসামি রয়েছেন। অভিযানে ৮০১ কেজি গাঁজা, ৪৫ হাজার পিস ইয়াবাসহ বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়।
এ ছাড়া মাদক পরিবহনে ব্যবহৃত ২টি পিকআপ, ১টি বাস, ২টি ট্রাক ও ২টি সিএনজি জব্দ করা হয়েছে। ডাকাতি মামলায় ব্যবহৃত ৪টি পিকআপ ও ১টি ট্রাক উদ্ধার করা হয়। ডাকাতদের কাছ থেকে লুণ্ঠিত স্বর্ণের গহনা ও কৃষকের ৮টি গরু উদ্ধার করে পুলিশ।

অস্ত্র উদ্ধারের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে। অভিযানে তিনটি বিদেশি পিস্তলসহ মোট ৪টি পিস্তল, ৪টি এলজি, ১টি পাইপগান, বিপুল পরিমাণ গুলি ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত ডিসেম্বর মাসে নতুন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান যোগদানের পর পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। জেলা পুলিশ ও ডিবি পুলিশের তৎপরতা আগের তুলনায় বহুগুণ বেড়ে যায়। নিয়মিত টহল, বিশেষ অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারির ফলে অপরাধ দমনে দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
পুলিশের এই তৎপরতায় সাধারণ মানুষের মাঝে স্বস্তি ফিরে আসছে। সেইসঙ্গে, কুমিল্লা জেলায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে বলে দাবি করছেন সাধারণ মানুষ ও সংশ্লিষ্টরা। পুলিশের ধারাবাহিক ও জোরালো অভিযানের ফলে অপরাধ প্রবণতা কমেছে, একই সঙ্গে জনমনে ফিরতে শুরু করেছে নিরাপত্তার অনুভূতি।
নগরীর মোগলটুলী এলাকার ব্যবসায়ী মো. জাহাঙ্গীর আলম মুন্সী বলেন, ‘গত এক দেড় মাসে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত অনেকটাই কমে গেছে। পুলিশ সক্রিয় হওয়ায় অপরাধীরা আত্মগোপনে চলে গেছে। এমন পুলিশি তৎপরতাই আমরা সাধারণ মানুষ চাই।’
কান্দিরপাড়ের এলাকার কাপড় ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন জানান, নতুন পুলিশ সুপার যোগদানের পর পুলিশের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও সক্রিয়তা স্পষ্টভাবে বেড়েছে। অপরাধ কমছে, আমরা সাধারণ মানুষ আশাবাদী পুলিশ আরও ভালো কাজ করবে।

কুমিল্লা সরকারি কলেজের বিএসএস শাখার শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আহম্মেদ সোহান বলেন, ‘গত এক মাসে পুলিশের ভূমিকা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। অপরাধীরা ভীত, আর সাধারণ মানুষ কিছুটা হলেও স্বস্তিতে রয়েছে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুশীল সমাজের এক প্রতিনিধি বলেন, পুলিশের কাজের গতি বেড়েছে, এটি ইতিবাচক। তবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা এবং নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হয়— সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। তাহলেই একটি সুস্থ ও নিরাপদ সমাজ গড়ে উঠবে।
এ বিষয়ে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান বলেন, ‘পুলিশ জনগণের সেবক। তাদের জানমাল রক্ষাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অপরাধ দমনে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। বিশেষ করে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ করতে পুলিশ আরও কঠোর ভূমিকা পালন করবে।’
উল্লেখ্য, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সারা দেশের মতো কুমিল্লাতেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। ওই সময় হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও দখলবাজির মতো অপরাধ নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়। বিশেষ করে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সময় কুমিল্লার জন্য একটি অস্থির ও উদ্বেগজনক অধ্যায় বলে মনে করছেন অনেকেই। এ সময়ে আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিল, অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন সহিংস কর্মকাণ্ড দেশজুড়ে আলোচিত হয়।