সিরাজগঞ্জ: কামারখন্দ উপজেলার চৌবাড়ী। চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষদের সেবাদানের লক্ষ্যে নির্মাণ করা হয়েছে ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল। তবে উদ্বোধন না হওয়ায় ১৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হাসপাতালটি দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে। এতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে কোটি টাকার যন্ত্রপাতি। এদিকে হাসপাতালের নির্জনতা বেছে নিয়েছে মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীরা। হাসপাতালটি এখন মাদকসেবীদের নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তরের পরেও হাসপাতালটি চালু না হওয়ায় কামারখন্দ, বেলকুচি ও উল্লাপাড়া উপজেলার পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
জানা গেছে, উদ্বোধনের আগেই হাসপাতাল থেকে প্রায় ৪০ লাখ টাকা মালামাল চুরি হয়ে গেছে। চুরির ঘটনায় থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোমিন উদ্দিন।
জেলা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তিন উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা কামারখন্দের চৌবাড়ী গ্রামে তিন একর জায়গার ওপর ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। হাসপাতালটির নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জেলা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর। হাসপাতালটির নির্মাণ কাজ শেষে ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সিভিল সার্জনের কাছে হস্তান্তর করে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর। হাসপাতালটি নির্মাণে ব্যয় হয় ১৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ বাবদ ব্যয় হয় ৩ কোটি ২১ লাখ ৮১ হাজার ৭৪৪ টাকা এবং অবকাঠামো নির্মাণে খরচ হয় ১৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা।
স্থানীয়রা জানান, এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল একটি হাসপাতাল। কিন্তু সেই হাসপাতাল নির্মাণ হলেও প্রায় আড়াই বছরেও সেটি চালু হয়নি। এই সুযোগে চোরেরা একদিকে হাসপাতালের মালামাল চুরি করছে, অপরদিকে ব্যবহার না করায় নষ্ট হচ্ছে হাসপাতালের কোটি টাকার যন্ত্রপাতি। শুধু তাই নয়, হাসপাতালটি চালু না হওয়ায় জায়গাটির নির্জনতা বেছে নিয়েছে মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারীরা।
অপরদিকে চুরির ঘটনায় থানায় দেওয়া অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, নির্মাণের পর থেকে হাসপাতালটি সরকারিভাবে এখনো চালু হয়নি এবং সেখানে কোনো জনবলও নিয়োগ দেওয়া হয়নি। হাসপাতালে কোনো নিরাপত্তা প্রহরী না থাকায় হস্তান্তরের পর থেকে ২০২৫ সালের ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে হাসপাতালের মালামাল চুরি করে নিয়ে যায় চোরেরা। চুরি হওয়া মালামালের মধ্যে রয়েছে প্রতিটি ওয়াশরুমের স্যানিটারি ফিটিংস, বৈদ্যুতিক মেইন লাইনের সার্কিটব্রেকার, প্রতিটি ইউনিটের ৫৫টি বৈদ্যুতিক পাখা, বৈদ্যুতিক বাল্ব ৯০টি, একটি এসির আউটডোর, পাওয়ার স্টেশনের ট্রান্সফরমার একটি, রান্নার কাজে ব্যবহৃত ফিটিংস জেনারেটরের ভিতরে থাকা তামার কয়েল, ব্যাটারি ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের তামার তার সহ অন্যান্য মালামাল। যার মূল্য প্রায় ৪০ লাখ টাকা।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোমিন উদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘হাসপাতাল চালু না হওয়ায় মালামাল চুরি করে নিয়ে গেছে চোরেরা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সিভিল সার্জনের সঙ্গে আলোচনা করে থানায় মামলার জন্য লিখিত অভিযোগ দিয়েছি।’
এ বিষয়ে কামারখন্দ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহীন আকন্দ সারাবাংলাকে জানান, হাসপাতালের মালামাল চুরির ঘটনায় উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বাদী হয়ে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের পর চুরি যাওয়া মামলার উদ্ধার ও দোষীদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিপাশা হোসাইন সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের সভায় চৌবাড়ীর ২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালের অর্গানোগ্রাম সিভিল সার্জনকে সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠাতে বলেছিলেন জেলা প্রশাসক। সেই আবেদন তিনি পাঠিয়েছেন কি না জানা নেই। ওই হাসপাতালে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হবে।
সিরাজগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. নুরুল আমীন সারাবাংলাকে বলেন, ‘হাসপাতালে চুরির ব্যাপারে থানায় মামলা করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।’