সিলেট: গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান থাকবে না ও মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতার মালা পড়ানোর সামিল হবে—এমন মন্তব্য করে তোপের মুখে পড়েছেন মৌলভীবাজার-১ আসনের জাতীয় পার্টির মনোনীত সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী আহমেদ রিয়াজ।
নির্বাচনি জনসভায় জাপা প্রার্থীর এমন একটি বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি ওই আসনের কয়েকজন ভোটারকে গণভোটে ‘না’ ভোট দেওয়ার জন্য প্ররোচিত করছেন।
হ্যাঁ ভোট, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষের উল্লেখ করে জাপা প্রার্থী আহমেদ রিয়াজ বলেন, ‘না ভোট’ শুধু জাতীয় পার্টির না, ‘না ভোট’ মানেই জিয়াউর রহমান, ‘না ভোট’ মানেই শহিদ জিয়া, ‘না ভোট’ মানেই বেগম জিয়া, ‘না ভোট’ মানেই একাত্তর, ‘না ভোট’ মানেই একাত্তরের স্বাধীনতা। সুতরাং আপনারা এখনই সিদ্ধান্ত নিন; ভোট দিবেন কোন প্রতীকে।
ভিডিওতে তাকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘১২ তারিখের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ভোট দিতে আসবে বলে নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ অবশ্যই ভোট দিতে আসবে— কারণ এটা তাদের স্বাধীনতার অস্তিত্বের লড়াই। তাই বঙ্গবন্ধুর সৈনিকরা গণভোটে “না” জয়যুক্ত করতে তারা ভোটে উপস্থিত হবে।
এ সময় সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। উপস্থিত কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, গণভোটের সঙ্গে স্বাধীনতার অস্তিত্ব ও মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতারমালা পড়ানোর সমতুল্য বলে ভুল তথ্য প্রচারণার জন্য বিক্ষুব্ধ জনতা জাতীয় পার্টিকে ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যা দিয়ে অভিযোগ তোলে বলেন, যে দল ২৪ এর গণ আন্দোলনে চেতনার পরিপন্থী অবস্থান নিয়েছে এবং নতুন করে দেশে ফ্যাসিবাদ কায়েমের চেষ্টা করছে।
জাপা প্রার্থীর এই ভিডিওটি ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে এবং নেটিজেনরা এতে নানা প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। অনেকে সমালোচনা করে লিখেছেন, যেখানে বিএনপি ‘হ্যাঁ’ ভোটের অবস্থান নিয়েছে, সেখানে বিএনপিকে বিতর্কিত করতে গণভোটে ‘না’-এর পক্ষে প্রচার করছে জাতীয় পাটির বিতর্কিত এই প্রার্থী।
এদিকে, নির্বাচনি জনসভার এমন বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এই আসনের সামাজিক সচেতন নাগরিক বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন।
অন্তনীল তোফায়েল নামের একজন পোস্ট করে লিখেন, আহমেদ রিয়াজ একজন স্বঘোষিত প্রফেশনাল টিকটকার, কিন্তু বাস্তবে তার কর্মকাণ্ড কেবল ছদ্মবেশ ও স্বার্থপর ভাওতাবাজির প্রতিফলন।এরআগে তিনি ডামি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে লাঙ্গল সমর্থকদের সঙ্গে এক নিদারুণ তামাশা সৃষ্টি করেছিলেন।
দুবাই প্রবাসী রাসেল মিয়া মন্তব্য করেন, দুবাই ভিসার দালালি করে এখন দেশে গিয়ে সে নির্বাচন করে মানুষকে ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে। অথচ ‘না ভোট’ মানে ভারতের গোলামী করা! হ্যাঁ ভোট মানে দেশের গণতন্ত্র রক্ষা করা। না ভোট মানে —বিনা ভোটে ১৭ বছর শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকা, হ্যাঁ ভোট মানে দেশে পুনরায় তত্ত্বাবধায় সরকার ফিরিয়ে আনা।
একই এলাকার মাহতাব উদ্দিন নামের একজন ফেইসবুকে মন্তব্য করেন, রিয়াজের মত নাপাক যেখানে আছে সেখানে শয়তানের দরকার নেই, অনেক নিরীহ প্রবাসী উনারে খুঁজছে পাওনা টাকা আদায় করার জন্য।
আমজাদ খোকন নামের একজন উনার পোস্ট করা ভিডিওতে মন্তব্য করেন, ২০২৪ সালের পাতানো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে উনি আগের রাত কাতার পালিয়ে গেছেন এবারও আগের রাত পালিয়ে যাবেন।
আহমেদ হোসেন নামের একজন মন্তব্য করেন, উনি গণভোট নিয়ে ভুল তথ্য দেয়ার জন্য উনাকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হোক।
এর আগেও তিনি নির্বাচনি প্রচারণায় আরেকটি ভিডিওতে লাঙ্গল প্রতীক ও নৌকা প্রতীক একই সমান বলে দাবি করেন। এবং গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হলে দেশ আফগানিস্তান ও পাকিস্তান হয়ে যাবে বলেও মন্তব্য করেন।
এ ব্যাপারে বড়লেখা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কাউন্সিলের আহবায়ক সিরাজ উদ্দিন সারাবাংলাকে জানান, গণভোটে ‘হ্যাঁ বা না ভোট’ দেওয়া প্রত্যেক জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা আছে। গণভোটের ব্যাপারে জাপা প্রার্থী আহমেদ রিয়াজের মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে এমন বেফাঁস মন্তব্য সঠিক হয়নি।
তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদেরকে এরকম বক্তব্য অবমাননার শামিল। তিনি এমন বিতর্কিত বক্তব্য না দেওয়ার জন্য আহবান জানান।
এ বিষয়ে সিলেট জেলা বারের আইনজীবী অ্যাডভোকট মোহাম্মদ তাজ উদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, কোন ব্যক্তি বা গোষ্টির বিরুদ্ধে মানহানিকর বক্তব্য দেওয়া দন্ডবিধির ৫০০ ধারা মোতাবেক দণ্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া, এ ধরনের মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা ইলেকট্রনিক প্রিন্ট মিডিয়ার প্রচার ও প্রকাশ করা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ মোতাবেকও ফৌজদারী অপরাধ। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের জড়িয়ে আপত্তিকর ও মানহানিকর বক্তব্য দেওয়া হলে বা সেটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার বা প্রকাশ করা হলে সেটি অবশ্যই দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।