কক্সবাজার: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কক্সবাজারজুড়ে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সরকার। সীমান্তবর্তী অবস্থান, উপকূলীয় ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পসংলগ্ন জনপদ থাকার কারণে কক্সবাজার জেলা বরাবরই নিরাপত্তার ক্ষেত্রে স্পর্শকাতর হিসেবে বিবেচিত। সেই বাস্তবতা মাথায় রেখে এবার সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথবাহিনী মাঠে নেমেছে ব্যাপক প্রস্তুতি, কঠোর নজরদারি ও সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে।
ভোটগ্রহণের আগে, ভোটের দিন এবং ভোট পরবর্তী সময়সহ পুরো নির্বাচনকালীন মেয়াদে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর বাইরে যাতায়ত কার্যত বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকা, সীমান্ত, উপকূল এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে বাড়ানো হয়েছে টহল, তল্লাশি ও গোয়েন্দা নজরদারি।
মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র মিলনায়তনে সেনাবাহিনীর রামু ১০ পদাতিক ডিভিশনের উদ্যোগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন ও সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য জানান লেফটেন্যান্ট কর্নেল তানভীর আহমেদ।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার জেলায় নির্বাচনী নিরাপত্তায় মোট ১৩ হাজার ৪৯৯ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছেন ২ হাজার ১৬৬ জন সেনা, ৮৮০ জন বিজিবি, ৩৯৯ জন নৌবাহিনী, ৫০ জন বিমান বাহিনী, ১৪৫ জন কোস্টগার্ড, ৮০ জন র্যাব, ১৯০ জন আনসার ব্যাটেলিয়ন ও ১ হাজার ৮১৫ জন পুলিশ সদস্য। এ ছাড়া আনসার ও ভিডিপির ৭ হাজার ৭৭৪ জন সদস্য ভোটকেন্দ্রগুলোতে দায়িত্ব পালন করবেন। প্রতি কেন্দ্রে তাঁদের ১৩ জন সদস্য নিয়োজিত থাকবেন।
তিনি বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে কোনো অশুভ শক্তি যেন রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে নাশকতা বা সহিংসতা সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। ভোটগ্রহণের আগে ও পরে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাইরে চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে এবং ক্যাম্পের ভেতর ও বাইরে গতিবিধি কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’
তিনি আরও জানান, ক্যাম্প এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া মেরামত, গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট স্থাপন, নিয়মিত টহল ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ক্যাম্পসংলগ্ন জনপদগুলোতে সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে।
লে. কর্নেল তানভীর আহমেদ বলেন, কক্সবাজার জেলার চারটি সংসদীয় আসনের দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে সেনাবাহিনীর স্ট্রাইকিং ফোর্স প্রস্তুত থাকবে। কোনো ভোটকেন্দ্রের ভেতরে বা বাইরে অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা বা সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিলে সেনাবাহিনী পুলিশ, র্যাব ও বিজিবিসহ অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে সরাসরি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেবে।
মতবিনিময় সভার আগে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে লেফটেন্যান্ট কর্নেল সুতফা জামান সাম্প্রতিক যৌথ অভিযানের বিস্তারিত তুলে ধরে জানান, গত ৩ থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথবাহিনী ৪৬টি অভিযান পরিচালনা করেছে। এসব অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে ছয়টি আগ্নেয়াস্ত্র, বিপুল পরিমাণ দেশীয় ধারালো অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য। একই সঙ্গে ক্যাম্পের বাইরে অবৈধভাবে বসবাসকারী ১ হাজার ১৪৯ জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে আলোচিত কয়েকটি হত্যা মামলার আসামিকেও।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ৩৪ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও ৯ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মাঠে থাকবেন।
জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আ. আজিজ জানান, কক্সবাজার জেলার চারটি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ১৮ লাখ ৪৯ হাজার ৩৫৭ জন। জেলার ৫৯৮টি ভোটকেন্দ্রের ৩ হাজার ৬৮৯টি কক্ষে ভোটগ্রহণ পরিচালনা করবেন ১২ হাজার ২৫১ জন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা।
জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আ. মান্নান জানান, প্রিসাইডিং ও সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার রয়েছেন ৪ হাজার ৫০৩ জন এবং পোলিং অফিসার ৭ হাজার ৭৪৮ জন। সব মিলিয়ে সীমান্ত, উপকূল, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্র সবখানেই কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আমাদের প্রত্যাশা, ভোটারদের সক্রিয় অংশগ্রহণে শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন হবে।