Wednesday 18 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

পর্যটনের আড়ালে শিশুশ্রম
সমুদ্র সৈকতে হারাচ্ছে দুরন্ত শৈশব

ইমরান হোসাইন, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:১৩

পর্যটনের আড়ালে শিশুশ্রম, সমুদ্র সৈকতে হারাচ্ছে শৈশব। ছবি: সারাবাংলা

কক্সবাজার: বিকেলের সূর্য তখন ডুবে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। নির্বাচনের কারণে পর্যটক কম থাকায় সোনালি আলোয় ঝিলমিল করা কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে। ঢেউয়ের শব্দে মিশে যাচ্ছে পর্যটকদের হাসি, ক্যামেরার ক্লিক, আর আনন্দ-কোলাহল। কেউ সেলফি তুলতে ব্যস্ত, কেউ ব্যস্ত পায়ের কাছে ছুটে আসা ঢেউ ছুঁয়ে দেখতে। এই উচ্ছ্বাসের মাঝেই নীরবে চলছে আরেকটি দৃশ্য। যা চোখে পড়ে না, এমনকি অনেকের উপলব্ধিও জাগায় না। কিন্তু তারা কক্সবাজারের পর্যটনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে। সৈকতের ভিড়ে হঠাৎ কানে আসা কিছু শিশু-কিশোরের হাঁকডাক- ‘সিদ্ধ ডিম নেবেন?, ‘ফ্রুটস চাট!’, ‘পানি বা কফি!’

বিজ্ঞাপন

এই কণ্ঠগুলো আনন্দের নয়, জীবিকার। হাতে ট্রে, ঝুড়ি বা খেলনার বাক্স নিয়ে তারা ছুটে চলে এক পর্যটক থেকে আরেক পর্যটকের দিকে। কেউ সৈকতে বিক্রি করছে, কেউ হোটেলের গরম রান্নাঘরে বাসন ধুচ্ছে, কেউ বা ওয়েটারের সহকারী হিসেবে ছুটছে। সম্প্রতি এক বিকেলে সৈকত এলাকায় ঘুরে কক্সবাজার পর্যটনের অদৃশ্য শিশুশ্রম চোখে পড়ে।

নাজিমুলের গল্প: শৈশবের বদলে ডিমের ঝুড়ি

নাজিমুল ইসলামের বয়স মাত্র ১৩ বছর। তার হাতে একটি ঝুড়ি, ভেতরে সিদ্ধ ডিম। প্রতিদিন অন্তত ৩০টি ডিম বিক্রি না হলে দিনটা ভালো যায় না। একসময় সে স্কুলে যেত। পঞ্চম শ্রেণিতে থাকা অবস্থঅয় পড়াশোনা থেমে যায়। দারিদ্রতা তার বই বন্ধ করে দিয়েছে। বরিশালের ভোলার বাসিন্দা নাজিমুল এখন থাকে কক্সবাজারে। তার বাবা সুগন্ধা পয়েন্টে ঝালমুড়ি বিক্রি করেন। ছেলেটাকেও নামতে হয়েছে সৈকতে। কলাতলি সৈকতে ডিম বিক্রির সময় নাজিমুল সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলে, ‘পড়তে মন চায়। কিন্তু খাওন না থাকলে পড়াশোনা দিয়ে কী হবে?’ তার চোখে সমুদ্রের ঢেউ নেই, আছে হিসাব; আজ কতটা বিক্রি হলো!

পর্যটনের আড়ালে শিশুশ্রম, সমুদ্র সৈকতে হারাচ্ছে শৈশব। ছবি: সারাবাংলা

পর্যটনের আড়ালে শিশুশ্রম, সমুদ্র সৈকতে হারাচ্ছে শৈশব। ছবি: সারাবাংলা

আরাফাত: আট বছরেই জীবনের বোঝা

আরাফাতের বয়স আট। পুরো নাম ইয়াসিন আরাফাত। কক্সবাজার সদর উপজেলার বাংলা বাজার এলাকার ছেলে। বাবা দিনমজুর, মা গৃহকর্মী। একবছর আগে আরাফাত স্কুল ছেড়েছে। এখন সে পরিবারের নিয়মিত উপার্জনক্ষম সদস্য। পর্যটন মৌসুমে তাকে কাজে লাগানো হয় সৈকতে বিভিন্ন জিনিস বিক্রির কাজে। আরাফাত সারাবাংলাকে বলে, ‘স্কুলে যেতাম। বই পড়তাম। কিন্তু এখন ঘরে খাবার না থাকলে স্কুলে গিয়ে কী করব?’

হোটেলে বাসন-কোসন ধোয়ার কাজ করে কিশোর রাশেদ। দিনে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা কাজ। মাসিক আয় আট হাজার টাকা। কোনো চুক্তি নেই, ছুটি নেই। অসুস্থ হলে কাজ বন্ধ, আয়ও বন্ধ। তার শৈশবটা যেন রান্নাঘরের ধোঁয়ার ভেতরেই হারিয়ে গেছে।

সৈকতের ছায়ামানুষগুলো

নাজিমুল, আরাফাতরা একা নয়। পর্যটন মৌসুম এলেই কক্সবাজারের লাবণী, সুগন্ধা, কলাতলী, ইনানী সৈকত ভরে যায় শত শত শিশুশ্রমিকে। হোটেল-রেস্তোরাঁয় ওয়েটারের সহকারী, রান্নাঘরের কাজ, বাসন পরিষ্কার, কক্ষ ঝাড়ু দেওয়া, সৈকতে খাবার, খেলনা, ঘোড়ার রাইড বিক্রি- সবখানেই তাদের উপস্থিতি। কিন্তু তারা যেন ছায়ার মতো। কাজ করে যায়, অথচ কেউ তাদের শ্রমিক হিসেবে দেখে না। কিন্তু তাদের শৈশব হওয়ার কথা ছিলে বর্ণিল। আর দশটা শিশু-কিশোরের মতো। পর্যটক নাজিম উদ্দীন সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম ওরা খেলছে। কিন্তু পরে লক্ষ্য করলাম, ওরা কাজ করছে।’

পরিসংখ্যানের পেছনের বাস্তবতা

শ্রম অধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, পর্যটন মৌসুমে কক্সবাজারে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৫০০ থেকে ৭০০। হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতে নিয়োজিত শিশুদের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের বয়স ১০-১৫ বছর। অধিকাংশই ঝরে পড়া শিক্ষার্থী অথবা অনিয়মিত ছাত্র। আইনে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ। কিন্তু মৌসুমি চাহিদার অজুহাতে এই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে।

পর্যটনের আড়ালে শিশুশ্রম, সমুদ্র সৈকতে হারাচ্ছে শৈশব। ছবি: সারাবাংলা

পর্যটনের আড়ালে শিশুশ্রম, সমুদ্র সৈকতে হারাচ্ছে শৈশব। ছবি: সারাবাংলা

স্বাস্থ্যঝুঁকি আর নিঃশব্দ যন্ত্রণা

শিশু শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। গরম রান্নাঘর, ভারী জিনিস তোলা, সারাদিন রোদে দাঁড়িয়ে বিক্রি, সব মিলিয়ে শরীর ও মনের ওপর প্রচণ্ড চাপ। ঘোড়ার রাইড বিক্রি করা ১৪ বছর বয়সী ফয়সাল সারাবাংলাকে জানায়, ‘সৈকতে হাঁটতে হাঁটতে পা ব্যথা করে, জ্বর আসে। কিন্তু কাজ না করলে টাকা পাই না।” চকরিয়া উপজেলার বানিয়ারছড়া থেকে কক্সবাজারে আসা ফয়সাল প্রতি হাজার টাকায় মাত্র ৩০০ টাকা কমিশন পায়। কোনো চিকিৎসা নেই, নিরাপত্তা নেই। পরিবার ছেড়ে কলাতলি এলাকায় ঘোড়া মালিকের কাছে একা থাকে সে।

দরিদ্রতা বনাম শৈশব

শিশু শ্রমের মূল কারণ দারিদ্রতা। অনেক পরিবার পর্যটন মৌসুমে শিশুর আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। নাজিমুলের বাবা অকপটে সারাবাংলার এই প্রতিবেদকেক বলেন, ‘ও কাজ না করলে সংসার চলবে না। স্কুলের কথা ভাবার সুযোগ নেই।’ এই আয়ে পরিবার বাঁচে, কিন্তু শিশুর ভবিষ্যৎ অন্ধকারেই থেকে যায়।

আইন আছে, প্রয়োগ নেই

বাংলাদেশে শিশুশ্রম আইনত নিষিদ্ধ। কিন্তু কক্সবাজারের পর্যটন এলাকায় নিয়মিত নজরদারি নেই। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্রম অধিদফতরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘জনবল কম। লিখিত অভিযোগ না এলে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন।’ কিন্তু স্থানীয়রা বলছেন, শিশু বা তাদের পরিবার অভিযোগ করবে কীভাবে? জীবিকার ভয় যে সবচেয়ে বড়।

অধিকারকর্মীদের সতর্কতা

শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, পর্যটনের আড়ালে শিশুশ্রম একটি গভীর মানবিক সংকট। সমাজকর্মী নজরুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, ‘যে উন্নয়ন শিশুদের শৈশব কেড়ে নেয়, তা কখনো টেকসই হতে পারে না।’

সমাধানের পথ

বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যটন মৌসুমে নিয়মিত অভিযান, হোটেল-রেস্তোরাঁয় শিশু নিয়োগে কঠোর শাস্তি, দরিদ্র পরিবারের বিকল্প আয়ের সুযোগ, স্কুলে ফেরাতে পুনর্বাসন কর্মসূচি এবং শিশু শ্রমমুক্ত পর্যটন নীতিমালা এখন সময়ের দাবি। শিশু অধিকারকর্মী ওমর ফারুক সারাবাংলাকে বলেন, ‘কক্সবাজার মানে আনন্দ, ছবি আর অর্থনীতি। কিন্তু সেই আনন্দের আড়ালে নাজিমুল, আরাফাত, ফয়সালদের মতো শিশুদের শৈশব হারিয়ে যাচ্ছে নীরবে। প্রশ্ন থেকে যায় এই পর্যটন কি তাদের জন্যও কিছু রেখে যাচ্ছে, নাকি শুধুই বড়দের লাভের খেলাই চলছে ?’

বিজ্ঞাপন

খুলনায় বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে আহত ৯
১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২৩:২৪

আরো

সম্পর্কিত খবর