সাতক্ষীরা: দেশের ৯৭৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জালিয়াতি, ভুয়া নিয়োগ ও সরাসরি অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতর (ডিআইএ)। এসব অনিয়মের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা প্রায় ৯০ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরতের সুপারিশ করা হয়েছে। এই তালিকায় সাতক্ষীরা জেলার ২৫টি নামী কলেজ, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদরাসার নাম উঠে এসেছে।
রোববার (২ ফেব্রুয়ারি) ডিআইএ’র পরিচালক প্রফেসর এম এম সহিদুল ইসলাম সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ১ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত তদন্তে এসব ভয়াবহ অনিয়ম ধরা পড়ে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, জাল সনদ ও ভুয়া নিয়োগের মাধ্যমে সরকারি অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। ডিআইএ মোট ৮৯ কোটি ৮২ লাখ ২৫ হাজার ৬০৭ টাকা ফেরত নেওয়ার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর বেহাত হওয়া ১৭৬ একর জমি উদ্ধারের সুপারিশ করেছে।
ডিআইএ’র যুগ্ম পরিচালক প্রফেসর মো. ইদ্রিস আলী বলেন, বিগত ৬ মাসে আমাদের টিম সরেজমিন তদন্ত চালিয়ে শিক্ষকদের নিবন্ধন ও বিএডিসহ বিভিন্ন সনদ জাল হিসেবে শনাক্ত করেছে। আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে কঠোর ব্যবস্থার সুপারিশ পাঠিয়েছি।
তদন্ত প্রতিবেদনে সাতক্ষীরা জেলার ৬টি উপজেলার ২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়ম খতিয়ে দেখে মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
তালিকা অনুযায়ী সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলায় ১০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেগুলো হলো- উলুডাংগা ওসমানীয়া দাখিল মাদরাসা, চন্দনপুর দাখিল মাদরাসা, কয়লা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলারোয়া আলিয়া সিনিয়র মাদরাসা, কাজীরহাট কলেজ, কেঁড়াগাছি ইউনিয়ন নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু মহিলা কলেজ, বাঁটরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, রামকৃষ্ণ সৈয়দ কামাল বখত মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় এবং হঠাৎগঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে- আলহাজ্ব মোহাম্মদ আলী দাখিল মাদরাসা, অ্যাডভোকেট আব্দুর রহমান কলেজ, গাভা অক্ষয় কুমার মিস্ত্রী আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, গাভা আইডিয়াল কলেজ, গোদাঘাটা বারাকাতিয়া দাখিল মাদরাসা ও গোয়ালপোতা গাছা খড়িয়াডাংগা খরিনখোলা কানাইলাল উচ্চ বিদ্যালয়।
কালিগঞ্জ উপজেলার ৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে- গোবিন্দকাটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, চাম্পাফুল আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যাপীঠ, বাবুলিয়া জে. এস (জয়মনি শ্রীনাথ) মাধ্যমিক বিদ্যালয়, রামনগর আদর্শ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় ও কিষান মজদুর ইউনাইটেড অ্যাকাডেমি।
তালা উপজেলায় ২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলো- আইডিয়াল মহিলা কলেজ ও খলিষখালী দাখিল মাদরাসা। এ ছাড়া দেবহাটা কলেজ (দেবহাটা) ও কলবাড়ী নেকজানিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় (শ্যামনগর) রয়েছে ওই তালিকায়।
ডিআইএ জানিয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদনের অনুলিপি সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড, জেলা শিক্ষা অফিস এবং প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সভাপতির ই-মেইলে পাঠানো হয়েছে। এখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় শুনানির মাধ্যমে দোষী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। সাধারণত জাল সনদধারী শিক্ষক শনাক্তকরণ, এমপিওভুক্তিতে অনিয়ম, উপবৃত্তির টাকা আত্মসাৎ এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে ডিআইএ এমন তদন্ত পরিচালনা করে। প্রতিটি প্রতিবেদনের বিপরীতে একটি সুনির্দিষ্ট স্মারক নম্বর দিয়ে শিক্ষামন্ত্রণালয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
সাতক্ষীরা জেলা নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক আজাদ হোসেন বেলাল বলেন, ‘এই কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম দূর হবে এবং স্বচ্ছতা ফিরবে।’
তিনি বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জালিয়াতি ও ভুয়া নিয়োগ শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, এটি শিক্ষাব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে। দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এমন অনিয়ম বন্ধ হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং আত্মসাৎ করা অর্থ দ্রুত সরকারি কোষাগারে ফেরত নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন কোনো প্রতিষ্ঠান এ ধরনের অনিয়ম করতে না পারে, সে জন্য নিয়মিত অডিট ও কঠোর মনিটরিং জোরদার করা জরুরি।’
সাতক্ষীরা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আলমগীর কবির বলেন, আমরা ডিআইএ’র চিঠি পেয়েছি। এতে জেলার ২৫টি কলেজ, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও মাদরাসার নাম উল্লেখ রয়েছে। কোন কোন শিক্ষক জড়িত-সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত বা অনিয়মের মাধ্যমে গ্রহণ করা অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দিতে হবে। সরকারের এ উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। অনেক সময় যোগ্য প্রার্থীরা বঞ্চিত হন, আবার কেউ কেউ জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে সুবিধা নেন। চলমান প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ ধরনের অনিয়ম কমবে বলে আশা করছি।