কক্সবাজার: বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) গত ফেব্রুয়ারি মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১৫ টাকা কমিয়ে ১৩৪১ টাকা নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু কক্সবাজারে সেই নির্ধারিত দামে গ্যাস মিলছে না। গত দুই মাসের বেশি সময় ধরে সরবরাহ সংকটের অজুহাতে প্রতি সিলিন্ডারে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি নিচ্ছে বিক্রেতারা। কোথাও কোথাও দাম উঠেছে ১৮৫০ টাকা পর্যন্ত।
মঙ্গলবার (৩ মার্চ) শহরের বাহারছড়া, নুনিয়াছড়া, গাড়ির মাঠ, অ্যান্ডারসন রোড, বাজারঘাটা, টেকপাড়া, রুমলিয়ার ছড়া ও আলির জাহাল এলাকায় ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে। বিভিন্ন দোকানে আই গ্যাস, ফ্রেশ, পেট্রোম্যাক্স, জেমআইসহ একাধিক কোম্পানির সিলিন্ডার বিক্রি হলেও কোথাও বিইআরসি নির্ধারিত মূল্যতালিকা কার্যকর হতে দেখা যায়নি।
গ্রাহকদের অভিযোগ, তিন মাস ধরেই বাড়তি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। তবে এবার মূল্যবৃদ্ধির মাত্রা অস্বাভাবিক। প্রতি সিলিন্ডারে ৪০০-৫০০ টাকা বাড়তি দেওয়ায় সাধারণ মানুষের সংসারে চাপ বেড়েছে। এলাকাভেদে ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাবাজার এলাকার কক্স ট্রেড লিংকের কর্ণধার ও ফ্রেশ কোম্পানির ডিলার মোহাম্মদ শাহাদাত জানান, প্রতিদিন তিন শতাধিক সিলিন্ডারের চাহিদা থাকলেও প্রায় ৬০ শতাংশ জোগান মিলছে। ১২ কেজির সিলিন্ডার পরিবেশকের কাছ থেকে তাকে ১৬০০-১৬৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। প্রতি সিলিন্ডারে ২০ টাকা মুনাফা থাকে। তার প্রশ্ন—কোম্পানি যদি ১৩৪১ টাকায় গ্যাস না দেয়, খুচরা পর্যায়ে দাম কমবে কীভাবে?
জেল গেইট এলাকার ওসানিক ট্রেডিংয়ের কর্ণধার গোলাম আরিফ লিটন জানান, দেশের বড় কোম্পানিগুলোর অনেকেই এখন সরবরাহ কমিয়েছে। অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠান আমদানি করছে। ৪০০ সিলিন্ডারের চাহিদা দিলে পাওয়া যাচ্ছে ১০০-২০০টি।
বাহারছড়ার কাজল এন্টারপ্রাইজের কাজল ও সাহিল অ্যান্ড সোহা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শফিউল আলম বলেন, ‘ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতিদিন তর্ক হচ্ছে। তারা ডিলারের কাছ থেকে বাড়তি দামে গ্যাস কিনে ৩০-৫০ টাকা লাভে বিক্রি করে। অনেক সময় ডিলাররা ভাউচারও দেয় না। ফলে অভিযোগের মুখে পড়তে হয় খুচরা বিক্রেতাদেরই।’
উল্লেখ্য, জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ দফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আটটি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এতে ১০টি প্রতিষ্ঠানকে মোট এক লাখ পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
জেলা ভোক্তা অধিকারের সহকারী পরিচালক হাসান আল মারুফ বলেন, ‘খুরুশকুল রাস্তার মাথা এলাকার মাম্মি এন্টারপ্রাইজ, জেলগেইটের ওসানিক ট্রেডিং, বাংলাবাজারের কক্স ট্রেড লিংকসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়েছে। খুচরা দোকানে নির্ধারিত মূল্যতালিকা প্রদর্শনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং নিয়মিত বাজার মনিটরিং চলছে।’
বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে এলপিজির বার্ষিক চাহিদা প্রায় ১৭ লাখ টন। পুরো বাজারই বেসরকারি আমদানিনির্ভর। নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ৫২টি, যার মধ্যে ৩২টির নিজস্ব প্ল্যান্ট রয়েছে। আমদানির সক্ষমতা আছে ২৩টির। তবে নিয়মিত আমদানি করছে মাত্র আটটি প্রতিষ্ঠান।
জেলা এলপিজি সমিতির সভাপতি সরওয়ার আলম বলেন, ‘চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে দামও কমবে না।’
বিইআরসি প্রতি মাসে এলপিজির মূল্য নির্ধারণ করলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন নেই—এমন অভিযোগ নতুন নয়। তবে কক্সবাজারে বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্ধারিত দাম ও বাজারদামের ব্যবধান ৫০০ টাকার কাছাকাছি পৌঁছানোয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ভোক্তাদের দাবি, কৃত্রিম সংকট ও সিন্ডিকেট ভাঙতে জোরালো নজরদারি প্রয়োজন।