গাইবান্ধা: ধান, গম, ভুট্টা, আলু, পাট, মরিচ ও চিনাবাদামসহ নানাবিধ ফসলের জন্য উর্বর গাইবান্ধা জেলার মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি। অথচ কৃষিনির্ভরতা বাড়লেও কৃষিখাতে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন, বাজার ব্যবস্থাপনা ও সরকারি সহায়তা না পাওয়ায় সংকটে পড়েছেন প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার ৩৭৮টি কৃষক পরিবার। তাদের জীবিকা আজ নানামুখী সমস্যা ও চরম অনিশ্চয়তায় জর্জরিত।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে গাইবান্ধার সাত উপজেলায় বোরো ধানের আবাদ হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৫৪২ হেক্টর জমিতে, যা মোট লক্ষ্যমাত্রার ৯৭ শতাংশ পূরণ করেছে। গম চাষ হয়েছে ৩ হাজার ২৭৮ হেক্টরে, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ১৬৫ হেক্টর। ভুট্টার আবাদ হয়েছে ১৭ হাজার ৫২০ হেক্টরে, যা লক্ষ্যমাত্রা ১৭ হাজার ১৪০ হেক্টরের কাছাকাছি। এ ছাড়াও, জেলায় আলু চাষ হয়েছে ১৩ হাজার ৮৩০ হেক্টর জমিতে, যা ১২ হাজার ৫০ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি।
গাইবান্ধার কৃষকরা জানান, খাদ্য উৎপাদনের বড় অংশ তাদের হাত ধরে হলেও উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য মিলছে না। ধান, গম, পাট, সবজি ইত্যাদি সবক্ষেত্রেই উৎপাদন খরচ বাড়ছে, কিন্তু বিক্রি করে খরচই ওঠাতে পারছে না বেশিরভাগ কৃষক। এতে অনেকের আর্থসামাজিক অবস্থান নিচে নেমে যাচ্ছে। এমনকি ফসল ফলানোর খরচ জোগাতে গিয়ে জমি বন্ধকও রাখতে হচ্ছে।
গাইবান্ধার সদর উপজেলার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের কৃষক রশিদুল মিয়া বলেন, ‘গত তিন মৌসুম ধরে ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচই তুলতে পারছি না। সার, বীজ, কীটনাশক, শ্রমিক, সেচ সবকিছুর দাম বাড়ছে। কিন্তু বাজারে ধানের দাম হয় পানির দরে।’
সাদুল্লাহ্পুর উপজেলার আলুচাষী সুনীল রায় বলেন, ‘গত মৌসুমেও আলু চাষ করে লোকসানের সম্মুখীন হয়েছিলাম। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার আশায় ঋণ করে এবারও দুই বিঘা জমিতে আবাদ করেছি। কিন্তু এবারও উৎপাদন খরচ তুলতে পারব না।’
একই উপজেলার কৃষক মিজানুর রহমান বলেন, ‘প্রতি বিঘায় আলু চাষে খরচ হয়েছে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। অথচ আমাদের কাছ থেকে ৮ টাকা কেজিতে আলু কিনছে পাইকাররা। একজন শ্রমিকের মজুরি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা, এক বিঘার আলু তুলতে ৮-১০ জন শ্রমিক লাগে। এই দামে বিক্রি করে শ্রমিক ও পরিবহন খরচই উঠছে না।’
প্রান্তিক কৃষকদের অভিযোগ, দাদাল ফড়িয়া, পাইকার ও সিন্ডিকেটচক্র একসঙ্গে বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে উৎপাদক দাম পান না, কিন্তু ভোক্তাদের কিনতে হয় বেশি দামে। করপোরেট বাণিজ্যিকীকরণের কারণে কৃষিপণ্যের বাজার বড় হয়েছে ঠিকই, কিন্তু কৃষকের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং মহাজনী ঋণ, দাদন ও সুদের চাপে অনেকেই জমি বিক্রি করতে বা বন্ধক রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।
তুলসীঘাট এলাকার কৃষক সিরাজুল বলেন, ‘জমি চাষ দিতে এখন এক বিঘায় খরচ লাগে আগের চেয়ে দ্বিগুণ। শ্রমিকের মজুরি বাড়ছে। ধানের চারা উৎপাদন থেকে ফসল কেটে ঘরে আনা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে দাম বেড়েছে । সবমিলিয়ে কৃষিকাজ করে লোকসান ছাড়া কিছু থাকে না।’
কৃষিবিদদের মতে, কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়লেও সঠিক বিপণন, পরিবহণ, সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনা না থাকায় লাভবান হচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী চক্র। গাইবান্ধায় সরকারি পর্যায়ে কৃষিপণ্য সংরক্ষণের দীর্ঘস্থায়ী অবকাঠামোও নেই বললেই চলে। ফলে ফসলের অতিরিক্ত উৎপাদনের সময় দাম পড়ে যায়। আর ফসলের ঘাটতি হওয়ার মৌসুমে সেই একই পণ্য ভোক্তাদের কিনতে হয় উচ্চমূল্যে।
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘এ জেলায় কৃষিপণ্যের উৎপাদন আগের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়েছে। আমরা কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনতে করনীয় বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছি।’
কৃষি বিশেষজ্ঞ রাহেনুল ইসলাম রেভিন বলেন, ‘উৎপাদন যতই বাড়ুক, যদি কৃষক সঠিক দামে ফসল বিক্রি করতে না পারে, তাহলে কৃষিখাত টিকবে না। গাইবান্ধার কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে টেকসই করতে সরকারি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ, কৃষকদের জন্য সরাসরি বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা চালু করা, দাদন ও উচ্চসুদের ঋণ নিয়ন্ত্রণ, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।’