রংপুর: রংপুর মহানগরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত চলাচলে তীব্র যানজটের কবলে পড়েছে নগরবাসী। রমজান মাসে এ ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে। দেখা গেছে, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রধান সড়কগুলোতে যানবাহন চলছে কচ্ছপগতিতে, মোড়ে মোড়ে অটোরিকশার দীর্ঘ জটলা। সিটি বাজার থেকে জাহাজ কোম্পানি মোড়, পায়রা চত্বর, মেডিকেল মোড়, সুপার মার্কেটসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে যান চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়ছে। ফলে কর্মজীবী, শিক্ষার্থী, রোগী ও কেনাকাটায় বের হওয়া মানুষের যাতায়াতে দ্বিগুণেরও বেশি সময় লাগছে।
সরেজমিন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সিটি বাজারের সামনে থেকে জাহাজ কোম্পানি মোড় পর্যন্ত মাত্র ১০০ গজ পথ যেতে অটোরিকশায় লাগছে ২০ মিনিট। পায়রা চত্বর থেকে প্রেসক্লাবের ৫ মিনিটের হাঁটাপথ অটোয় যেতে সময় লাগছে আধা ঘণ্টা। ফুটপাত দখল করে দোকানপাট, রাস্তার মাঝে অটোরিকশার অবৈধ স্ট্যান্ড, যত্রতত্র পার্কিং ও যাত্রী ওঠানামা—সব মিলিয়ে নগরের প্রধান সড়কগুলো হয়ে উঠেছে চলাচলের অযোগ্য। রোজার গরমে পণ্য হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ক্রেতা থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী—সবাই অতিষ্ঠ।
যানজটের মূল কারণ কী?
স্থানীয়দের অভিযোগ, নগরে অনিবন্ধিত ইজিবাইক ও অটোরিকশার সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। রংপুর সিটি করপোরেশনের তথ্যানুসারে, ২০১২ সাল থেকে এ পর্যন্ত মোট ১১ হাজার ৪৯২টি তিন চাকার যানবাহনের নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে (২০০৯ সালে প্রথম দফায় ৩ হাজার ৩১৩টি)। তবে সরকার পরিবর্তনের পর নতুন নিবন্ধন বন্ধ থাকলেও বর্তমানে শহরে চলছে ২০ থেকে ২৫ হাজারেরও বেশি ইজিবাইক ও অটোরিকশা। এর মধ্যে অধিকাংশই অবৈধ ও নাম্বারবিহীন। উপজেলা থেকে বিনা বাধায় এসব যান শহরে ঢুকে পড়ছে।
এ ছাড়া, সরু ও খানাখন্দে ভরা সড়ক, ফুটপাত দখল, ক্লিনিক-হাসপাতালে পার্কিংয়ের অভাব, ডাম্পিং জোন না থাকা এবং সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক পুলিশের সমন্বয়হীনতা যানজটকে আরও জটিল করেছে। নাগরিক সমাজসহ সব পক্ষ বলছে, অনিবন্ধিত অটোরিকশা চলাচল বন্ধ না করলে যানজট নিরসন সম্ভব নয়।
নগরবাসীর দুর্ভোগ ও প্রতিক্রিয়া
মুলাটোলের বাসিন্দা কর্মজীবী সেলিম মিয়া সারাবাংলাকে বলেন, ‘যানজট এখন গলার কাঁটা। গাড়িগুলো নিজস্ব লাইন মেনটেইন করলেও অনেক ভোগান্তি কমত।’ শিক্ষার্থী নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, ‘অটো-রিকশার জটে ফুটপাতও নেই, হেঁটে স্কুলে যেতে হয়। প্রশাসনের চোখে এসব পড়ে না।’ অটোচালক আনিস মিয়া সারাবাংলাকে জানান, ‘অটো বেড়েছে, ভাড়া কমেছে, নাম্বারবিহীন গাড়ি চলে—পুলিশ ধরে না।’
পুলিশ ও প্রশাসনের অবস্থান
রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (ট্রাফিক) লিমন রায় জানান, যানজট নিরসনে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। প্রতিদিন ১০-২০টি অবৈধ ইজিবাইক জব্দ ও ২ হাজার ৫০০ টাকা করে জরিমানা করা হচ্ছে। তবে সমস্যা হলো—ডাম্পিং জোন দূরে (কোতোয়ালি বা তাজহাট থানায়)। ফলে একটি গাড়ি ডাম্পিং করে আসতে ফোর্সের অনেক সময় নষ্ট হয়। ট্রাফিক বিভাগে মোট ১০১ জন পুলিশ, দৈনিক ৭০ জন দায়িত্ব পালন করেন। পুলিশের দাবি—সবার সহযোগিতা ছাড়া পুরোপুরি সমাধান সম্ভব নয়।
সিটি করপোরেশনের নগর পরিকল্পনাবিদ মো. নজরুল ইসলাম সারাবাংলাকে জানান, যানজট কমাতে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের মিঠাপুকুর থেকে হাজীরহাট এবং দমদমা থেকে মাহীগঞ্জ হয়ে নবদীগঞ্জ পর্যন্ত দুটি বাইপাস সড়কের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে—এখনো অনুমোদন হয়নি।
সমাধানের পথ ও সাম্প্রতিক উদ্যোগ
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও পরিবেশকর্মী মুনীর চৌধুরী সারাবাংলাকে বলেন, ‘সড়কে কোনো শৃঙ্খলা নেই। পুলিশের পদক্ষেপ কম, সিটি করপোরেশন-পুলিশের সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট।’ সুজনের খন্দকার ফখরুল আনামের মতে, ‘অনিয়ন্ত্রিত ইজিবাইক নিবন্ধন বন্ধ করতে হবে। বিকল্প সড়ক নির্মাণ, চক্রাকার বাস সার্ভিস চালু করা যেতে পারে।’
তবে পুলিশ বলছে, ট্রাফিক পুলিশ অনিবন্ধিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে। ঈদ সামনে রেখে একমুখী সড়ক ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সিটি করপোরেশন, পুলিশ ও নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ জট খোলা কঠিন।
উল্লেখ্য, শুধু রংপুরেই এসব অটো চার্জিংয়ে মাসে ৯০-১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ খরচ হচ্ছে—যা জাতীয় গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে। জাতীয় পর্যায়ে বিআরটিএও অটোরিকশাকে নির্দিষ্ট রুটে চালানো, বাধ্যতামূলক নিবন্ধন-লাইসেন্স ও নিরাপদ মডেলে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে।
রংপুর নগরবাসী এখন শুধু একটি প্রশ্ন করছেন—কবে খুলবে এ জট? প্রশাসনের সদিচ্ছা ও নাগরিক সহযোগিতায় যদি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তবেই সম্ভব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা।