টাঙ্গাইল: আনারসের রাজধানী টাঙ্গাইলের মধুপুরে এবার সূর্যমুখী ফুলের চাষ করে সফলতা অর্জন করেছেন স্বর্ণপদক প্রাপ্ত কৃষি উদ্যোক্তা ছানোয়ার হোসেন। তার হাত ধরে গড়ে ওঠা পাহাড়ি গড়ের সূর্যমুখী ফুলের বাগান শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বাড়ায়নি, কৃষিতে নতুন সম্ভাবনাময় দুয়ার খুলে দিয়েছে।
এরইমধ্যে তিনি মধুপুরে বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষ, গড়ের লাল মাটিতে কাজু বাদাম, আনারস, ড্রাগন, মাল্টা, কফি এবং প্রথমবারের মতো ওষধি গুণসম্পন্ন ‘রোজেলা চা’ চাষ করে ব্যাপক সফলতা লাভ করেছেন কৃষি উদ্যোক্তা ছানোয়ার হোসেন। কৃষি ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান ও নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারের জন্য সে ২০২৪ সালে স্বর্ণপদক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

উপজেলা কৃষি বিভাগ বলছে, কৃষি প্রণোদনার আওতায় মধুপুর চাষ হয়েছে তেলজাতীয় ফসল এই সূর্যমুখী ফুল। আবহাওয়া অনূকুলে থাকায় গতবারের মতো এবারও সূর্যমুখীর ভালো ফলন হয়েছে। এছাড়া বর্তমানে আকাঁশ ছোয়া তেলের দাম বৃদ্ধিতে ভোজ্য তেলের চাহিদাও পূরণ করবে এ হাইব্রিড জাতের সূর্যমুখী। কম খরচে ভালো ফলন হওয়ায় দিন দিন সূর্যমুখী চাষে ব্যাপক আগ্রহ বাড়ছে কৃষকের মাঝে। মধুপুরে সূর্যমুখী চাষে কৃষক সানোয়ার হোসেনের এ সাফল্য প্রমাণ করে, সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগ থাকলে কৃষিতে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব।
উপজেলার মধুপুর মহিষমারা ইউনিয়নের মহিষমারা গ্রামের পাহাড়ি অঞ্চলে হলুদ রঙের সূর্যমুখী ফুলে ভরে উঠেছে কৃষক সানোয়ার হোসেনের খেত। কম খরচে অধিক ফলন এবং সূর্যমুখীর তেল জাতীয় এ বীজ চাষ ভালো হওয়ায় সূর্যমুখীর হাসিতে হাসছে মধুপুরের গ্রাম-বাংলার ফসলি জমি। ভোর হলেই মিষ্টি সোনা রোদে ঝলমল করে উঠে সূর্যমুখী ফুলগুলো। সূর্যমুখী দেখতে কিছুটা সূর্যের মতো। দেখে মনে হয় সবুজ পাতার আড়াল থেকে মুখ উঁচু করে হাসছে। এ খেতে প্রায় প্রতিদিন চলে প্রজাপতি আর মৌ-মাছির মেলা। নয়ন জুড়ানো এ দৃশ্যে খুশি কৃষক, তেমনি মোহিত করছে ফুলপ্রেমী মানুষকে।
প্রতিদিনই এলাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কৃষক, শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীরা মাঠ দেখতে ভিড় করছেন। অনেক কৃষক সরাসরি মাঠে এসে চাষ পদ্ধতি, সার ব্যবস্থাপনা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন। ছানোয়ার হোসেন নিজ উদ্যোগে তাদের পরামর্শ দিচ্ছেন এবং সূর্যমুখী চাষে উদ্বুদ্ধ করছেন।
স্থানীয় কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে মধুপুরে পাহাড়ি ইউনিয়ন গুলোতে বেশি সূর্যমুখী চাষ হয়েছে। এ উপজেলার এ বছর মোট ৪৮ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখী চাষ করা হয়েছে। গত বছর আবাদ হয়েছিল ১৮ হেক্টর। এ বছর উৎপাদন হয়েছে ২৫ হেক্টর জমিতে, যা গত বছরের চেয়ে ৬ হেক্টর বেশি। সূর্যমুখী ফুলে শতকরা ৯৯ ভাগ উপকারী ফ্যাট আছে। এতে রয়েছে ওমেগা-৬, ওমেগা-৯, অলিক এসিড, ভিটামিন-ই, ভিটামিন-কে এর মতো গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন ও মিনারেল। সরিষা ও সয়াবিনের চেয়ে সূর্যমুখী তেল অসস্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের পরিমাণ কম থাকে।
কৃষি পদকপ্রাপ্ত কৃষি উদ্যোক্তা ছানোয়ার হোসেন এর সাথে আলাপকালে তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘এ বছর সে ২ বিঘা জমিতে বারি-৩ জাতের সূর্যমুখী ফুল চাষ করেছেন। ফলন ভালো হয়েছে। অন্যান্য ফসলের তুলনায় সূর্যমুখী চাষে সময় কম লাগে। অল্প সময়ে ফসল পাওয়া যায়। লাভ অনেক বেশি। সরিষা ও সয়াবিন তেলের চেয়ে সূর্যমুখী তেলে রয়েছে অনেক পুষ্টিগুণ। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে অনেক ফুলপ্রেমী ও শিক্ষার্থীরা তার সূর্যমুখীর খেত দেখতে আসেন বলেও জানান তিনি।’
তিনি জানান, ধান বা অন্যান্য প্রচলিত ফসলের তুলনায় সূর্যমুখী চাষে পানির প্রয়োজন কম এবং সার ও কীটনাশকের ব্যবহারও সীমিত। ফলে উৎপাদন খরচ কমে আসে। সূর্যমুখী গাছ তুলনামূলকভাবে খরা সহনশীল হওয়ায় মধুপুরের মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে বেশ মানানসই। তিনি আরও বলেন, সূর্যমুখী বীজ থেকে উৎপাদিত তেল স্বাস্থ্যসম্মত ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ হওয়ায় বাজারে এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।
এ উদ্যোক্তা আরও জানান, দীর্ঘদিন ধরে আধুনিক ও উদ্ভাবনী কৃষি কার্যক্রমের সঙ্গে তিনি যুক্ত। কৃষিকে লাভজনক করতে হলে নতুন নতুন ফসল চাষের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে কৃষিতে সফলতা অর্জন করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।
মধুপুর উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি অফিসার এরশাদ আলী সারাবাংলাকে বলেন, ‘সূর্যমুখী এমন একটি ফসল যার খরচ কম লাভ বেশি। অন্যান্য তেলের চেয়ে সূর্যমুখী ফুলের তেলের পুষ্টি অনেক বেশি। এ বছর সূর্যমুখীর চাষে ভালো ফলন হয়েছে। এ কারণে কৃষকের সূর্যমুখী ফুল চাষে দিন দিন আগ্রহ বাড়ছে। অনেকেই আগ্রহ প্রকাশ করছে। আগামীতে মহিষমারা ইউনিয়নে সূর্য মুখীর আবাদ আরো বৃদ্ধি পাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।’
মধুপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ রকিব আল রানা সারাবাংলাকে বলেন, ‘সূর্যমুখীর তেল অন্যান্য তেলের থেকে অনেক পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। সূর্যমূখী একটি লাভজনক, সুভাষীত ও অর্থকরী ফসল। মধুপুরের কৃষি উদ্যোক্তা ছানোয়ার হোসেনের এই চমকপ্রদ সাফল্য স্থানীয় কৃষিতে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে মধুপুর অঞ্চলে তেলজাত ফসল উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সেইসঙ্গে সূর্যমুখী চাষ আরো সম্প্রসারণ করা গেলে ভোজ্যতেলের ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে এবং কৃষকদের আয় বাড়বে।’