রংপুর: দাম ধসের কারণে যখন আলুচাষিরা দিশেহারা, ঠিক তখনই হঠাৎ অকাল ঝড় ও ভারি বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ খেত। এরই মধ্যে খেতে জমা বৃষ্টির পানিতে আলুর পচন ধরার তীব্র শঙ্কা দেখা দিয়েছে। একদিকে কেজিপ্রতি ৫ থেকে ৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে আলু—যা উৎপাদন খরচের অর্ধেকেরও কম—অন্যদিকে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসল বাঁচাতে হিমশিম খাচ্ছেন চাষিরা। ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’—এই কথায় যেন ফুটে উঠেছে তাদের অসহায়ত্ব।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) দিবাগত ভোর থেকেই শুরু হয় বৃষ্টি। ৫ ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতে নগরীর মাহিগঞ্জ, আমাশু কুকরুল, পালিচড়া, পীরগাছা উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকার আলুখেত পানিতে ডুবে যায়। এ ছাড়া, পীরগাছার তাম্বুলপুর, ছাওলা, অন্নদানগর ও কান্দি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ মাঠেও পানি জমে আছে। চাষিরা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন পানি সরিয়ে ফসল বাঁচাতে।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মো. মোস্তাফিজুর রহমান সারাবাংলাকে জানান, আগামী ৪-৫ দিন থেমে-থেমে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। এমন বৃষ্টির খবরে আলুতে পচন ধরার তীব্র আশঙ্কায় দিশেহারা আলুচাষি। পীরগাছার ছাওলা ইউনিয়নের কৃষক ইসমাইল হোসেনের কণ্ঠে এখন শুধুই হতাশা। সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘১০ বিঘা জমিতে আলু লাগিয়েছি, ফলনও ভালো হয়েছে। কিন্তু এই ঝড়-বৃষ্টিতে সব শেষ। সকালে এসে দেখি খেত পানিতে ভাসছে। পানি কমানোর চেষ্টা করেছি, কিন্তু বাজারে দাম তো ৮-১০ টাকা কেজি। এখন আরও কমবে। এটা মরার ওপর খাঁড়ার ঘা!’
আরেক চাষি এমদাদুল হক বাবু সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘সারের দাম বেড়েছে, ধার-দেনা করে চাষ করেছি। দাম না পাওয়ায় খেতেই আলু রেখেছিলাম। ভালো দাম মিললে বিক্রি করব ভেবেছিলাম। কিন্তু বৃষ্টিতে সব নষ্ট হয়ে গেল। গ্রামের অধিকাংশ চাষিই এখন বড় ক্ষতির মুখে।’
নগরীর আমাশু কুকরুল এলাকার কৃষক মোহাম্মদ আরিফ সারাবাংলাকে জানান, তিনি ২৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। দাম কম, সিন্ডিকেটের চাপ, এখন বৃষ্টি—সব মিলিয়ে গতবছরের মতো এবারও লোকসানের আশঙ্কা করছেন। অনেকে গতবছর হিমাগারে রাখা আলু দাম কম থাকায় তুলতে পারেননি। এখন নতুন করে এই দুর্যোগ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, রংপুর বিভাগের আট জেলায় এবার ২ লাখ ২৫ হাজার ৯৮৫ হেক্টরে আলু চাষ হয়েছে। এতে উৎপাদন প্রায় ৫৬ লাখ ৬৮ হাজার টন। রংপুর জেলায় লক্ষ্যমাত্রা ৫৪ হাজার ৫০ হেক্টর (গত বছর ছিল ৬৬ হাজার ২৮০ হেক্টর)। বিভাগের ১১৬টি হিমাগারে সংরক্ষণ সক্ষমতা মাত্র ১১ লাখ ৯ হাজার টন। ফলে বিপুল আলু খোলা রাখতে হয়েছে, যা এখন বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে। এই পানি এখন পচনের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
সংস্থাটি বলছে, হিমাগারে রাখা আলুতেই এবার প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে। রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘রেকর্ড পরিমাণ আবাদ হয়েছে, কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতি। পচনের শঙ্কা রয়েছে। চাষিদের পানি সরিয়ে আলু রক্ষার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। না হলে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে চাষিদের।
বাংলাদেশ খেতমজুর ও কৃষক সংগঠনের রংপুর জেলা আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন বাবলু সারাবাংলাকে বলেন, ‘আলু কেজিপ্রতি ৩-৪ টাকায় নেমেছে। সারের সংকট-দাম বৃদ্ধি, সিন্ডিকেট—এসবের মাঝে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। আলু দেশের প্রধান অর্থকরী ফসল, বিশ্বব্যাপী চাহিদা আছে। সরকারের উচিত ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা, সার ভর্তুকিতে দেওয়া ও কালোবাজারি বন্ধ করা।’
কৃষি অর্থনীতি গবেষক শাহরিয়ার আহমেদ সাদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘ঈদের আগমুহূর্তে রংপুরের এই চাষিরা শুধু ফসল ফলান না, পরিবার-সন্তানের স্বপ্ন বুনেন। কিন্তু দামধস আর ঝড়-বৃষ্টির দ্বিমুখী আঘাতে তাদের চোখে জল। সরকারি সহায়তা, ক্ষতিপূরণ ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান না হলে এই কষ্টের চক্র থামবে না।’
উল্লেখ্য, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রংপুর বিভাগে আলুর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৮ লাখ টনের বেশি। তবে বাজারদর কমে যাওয়ায় অনেক কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। একই সময় বোরো মৌসুমে ইউরিয়া, ডিএপি ও এমওপি সারের দাম ২০-৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে এবং বিভিন্ন এলাকায় সার সংকটের অভিযোগ উঠেছে। ফলে চিন্তা বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে যে, এবার কৃষকরা লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বোরো উৎপাদনে কতটুকু আগ্রহ দেখাবে।