কক্সবাজার: কক্সবাজার জেলায় জ্বালানি তেলের মজুদ দ্রুত কমে যাওয়ায় সম্ভাব্য বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে জেলার সাতটি উপজেলায় পেট্রোলের মজুদ পুরোপুরি ফুরিয়ে গেছে। অকটেন ও ডিজেলের ক্ষেত্রেও চাহিদার তুলনায় বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলে সীমিত সরবরাহের কারণে পেট্রোল পাম্পগুলোতে সকাল থেকে দীর্ঘ লাইন, পরিবহণ খাতে চাপ এবং উপকূল ও দ্বীপাঞ্চলে চলাচলে ভোগান্তি বাড়ছে।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) শহরের কয়েকটি পেট্রোল পাম্পে সকাল থেকেই মোটরসাইকেল, সিএনজি ও ব্যক্তিগত গাড়ির লম্বা সারি দেখা গেছে। অনেক চালক ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও তেল পাচ্ছেন না। কেউ কেউ খালি ট্যাংক নিয়েই ফিরে যাচ্ছেন।
জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কক্সবাজার জেলায় মোট ৩২টি পেট্রোল পাম্প রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৪টি, রামুতে ৪টি, ঈদগাঁওয়ে ৪টি, চকরিয়ায় ৩টি, পেকুয়ায় ১টি, মহেশখালীতে ৩টি, উখিয়ায় ৩টি এবং টেকনাফে ৭টি পাম্প রয়েছে। দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ায় কোনো পেট্রোল পাম্প নেই। ফলে সেখানে দীর্ঘদিন ধরেই জ্বালানি সরবরাহ নির্ভর করে মূল ভূখণ্ড থেকে ডিলারদের নেওয়া তেলের ওপর।
সংকটের চিত্র
কক্সবাজার জেলায় এক সপ্তাহের জ্বালানি তেলের চাহিদা ও মজুদের হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জেলাজুড়ে মোট প্রায় ১০ লাখ ৭৩ হাজার ১৭২ লিটার জ্বালানি তেলের ঘাটতি রয়েছে। উপজেলা ভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা দিয়েছে চকরিয়া উপজেলায়, যেখানে মোট ঘাটতি প্রায় ৩ লাখ ৭২ হাজার ২২৬ লিটার। এর মধ্যে ডিজেলের ঘাটতিই সবচেয়ে বেশি। এরপর রয়েছে পেকুয়া উপজেলায় প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮০৯ লিটার এবং রামু উপজেলায় প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার ২০০ লিটার জ্বালানির সংকট।
অন্যদিকে মহেশখালী উপজেলায় প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার ৩৩৮ লিটার, ঈদগাঁও উপজেলায় প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার লিটার এবং উখিয়া উপজেলায় প্রায় ৯৮ হাজার লিটার জ্বালানি তেলের ঘাটতি রয়েছে। তুলনামূলকভাবে কম সংকট থাকা সদর উপজেলার প্রায় ৪৪ হাজার ৬৪৯ লিটার এবং টেকনাফ উপজেলায় প্রায় ৪২ হাজার লিটার। সবচেয়ে কম ঘাটতি দেখা গেছে কুতুবদিয়া উপজেলায়, যেখানে মোট সংকট প্রায় ৫ হাজার ৯৫০ লিটার।
সাত উপজেলায় পেট্রোলের মজুদ নেই
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, রামু, ঈদগাঁও, চকরিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী, উখিয়া ও টেকনাফ। এই সাত উপজেলায় বর্তমানে পেট্রোলের কোনো মজুদ নেই। এতে মোটরসাইকেল, সিএনজি ও ছোট যানবাহনের চালকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। জেলা সদরে কিছু পেট্রোল মজুদ থাকলেও সেটি চাহিদার তুলনায় অনেক কম। একই চিত্র অকটেন ও ডিজেলের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে। ফলে সরবরাহে সামান্য চাপ বাড়লেই দ্রুত সংকট প্রকট হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।
কক্সবাজার সদরেও বড় ঘাটতি
জেলা সদর এলাকায় প্রতি সপ্তাহে অকটেনের চাহিদা প্রায় ৩৩ হাজার ৫০০ লিটার। অথচ মজুদ রয়েছে মাত্র ১৬ হাজার ২৮৮ লিটার। অর্থাৎ প্রায় ১৭ হাজার লিটারের ঘাটতি। পেট্রোলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। চাহিদা প্রায় ১৩ হাজার লিটার হলেও মজুদ রয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৮৫৯ লিটার। ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৮৪ হাজার লিটার হলেও মজুদ রয়েছে প্রায় ৬৪ হাজার লিটার। এখানেও প্রায় ২০ হাজার লিটারের ঘাটতি রয়েছে।
রামু ও ঈদগাঁওয়ে তীব্র চাপ
রামু উপজেলায় প্রতি সপ্তাহে অকটেনের চাহিদা প্রায় ৪০ হাজার লিটার। কিন্তু মজুদ রয়েছে মাত্র ৯ হাজার ৮০০ লিটার। ডিজেলের চাহিদা প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার লিটার হলেও মজুদ আছে মাত্র ৩৪ হাজার লিটার। ঈদগাঁও উপজেলায় অকটেনের চাহিদা প্রায় ৩৯ হাজার লিটার হলেও মজুদ রয়েছে মাত্র ১০ হাজার লিটার। ডিজেলের চাহিদা প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার লিটার, বিপরীতে মজুদ রয়েছে মাত্র ৩২ হাজার লিটার।
দ্বীপ ও উপকূলে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক
দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ায় সপ্তাহে অকটেনের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৭৫০ লিটার হলেও মজুদ রয়েছে মাত্র ১ হাজার লিটার। ডিজেলের চাহিদা প্রায় ২০ হাজার লিটার, মজুদ রয়েছে ১৭ হাজার লিটার।
মহেশখালীতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। এখানে প্রতি সপ্তাহে অকটেনের চাহিদা প্রায় ২০ হাজার লিটার, কিন্তু মজুদ রয়েছে মাত্র ৬৩৭ লিটার। ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৯৮ হাজার লিটার হলেও মজুদ আছে মাত্র ১২ হাজার লিটার।
উপকূলীয় এই দুই উপজেলায় জ্বালানি সংকট দেখা দিলে মাছ ধরার ট্রলার, নৌযান ও স্থানীয় পরিবহন ব্যবস্থা বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্পিডবোট চলাচলে প্রভাব
জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সাগরপথের যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও। পেট্রোলের অভাবে মহেশখালী ও সেন্টমার্টিন রুটে স্পিডবোট চলাচল ইতিমধ্যে সীমিত হয়ে গেছে।
কক্সবাজার স্পিডবোট মালিক সমিতির নেতা দিদাররুল ইলাম বলেন, ‘মহেশখালী রুটে প্রতি ট্রিপে একটি স্পিডবোট চালাতে প্রায় ৮ লিটার পেট্রোল লাগে। কিন্তু এখন আমাদের সর্বোচ্চ ১০ লিটার করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে একটি স্পিডবোট দিনে একবারের বেশি যাতায়াত করতে পারছে না। এতে যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ছে।’
তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে সাগরপথের যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে, যা ঈদ যাত্রাকে চরমভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
সীমিত সরবরাহে পাম্পে দীর্ঘ লাইন
সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বর্তমানে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কম। ফলে অনেক পাম্পে সীমিত সরবরাহ চালু করা হয়েছে। কিছু এলাকায় প্রতি মোটরসাইকেলে সর্বোচ্চ ২ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি দেওয়া হচ্ছে। নৌযানের ক্ষেত্রে কোথাও কোথাও ১০ লিটার পর্যন্ত সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এতে শহরের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে সকাল থেকেই মোটরসাইকেল, সিএনজি ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক চালক তেল না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।
মোটরসাইকেলচালক শাহজাহান বলেন, ‘সকালে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি। প্রায় দুই ঘণ্টা হয়ে গেছে, এখনো তেল পাইনি। কাজকর্ম সব বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।’
সিএনজিচালক মনসুর বলেন, ‘দিন এনে দিন খাই। তেল না পেলে গাড়ি চালাবো কীভাবে? সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকলে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে যায়।’
কুতুবদিয়ায় খুচরা বাজারেও সংকট
দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ায় খুচরা দোকানগুলোতেও জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে। বড়ঘোপ বাজারসহ কয়েকটি এলাকায় অনেক দোকান তেল বিক্রি বন্ধ রেখেছে, আবার কেউ কেউ সীমিত পরিসরে বিক্রি করছে।
স্থানীয় মাহিন্দ্রা অটোরিকশাচালক আজমগীর, সাখাওয়াত ও আমিন জানান, তাদের গাড়িতে প্রতিদিন প্রায় ছয় লিটার তেল প্রয়োজন হয়। কিন্তু সংকটের কারণে দুই লিটারের বেশি তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে কয়েক ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
কিছু চালকের অভিযোগ, বাড়তি দামের আশায় কিছু ব্যবসায়ী তেল মজুত করে দোকান বন্ধ রেখেছেন।
পাচার ঠেকাতে সীমান্তে নজরদারি
এদিকে জ্বালানি তেল পাচারের আশঙ্কায় টেকনাফ সীমান্তে নজরদারি জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
টেকনাফ ২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হানিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহ ও বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় সীমান্ত দিয়ে জ্বালানি তেল পাচারের আশঙ্কা থাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
পর্যটন, পরিবহণ ও মৎস্য খাতে উদ্বেগ
কক্সবাজার হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, ‘ঈদকে কেন্দ্র করে পর্যটন ব্যবসায়ীরা সারা বছর অপেক্ষা করেন। গত বছর ঈদের ছুটিতে প্রায় ১০ লাখ পর্যটক কক্সবাজারে এসেছিলেন এবং তখন প্রায় ৮০০ কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান জ্বালানি সংকট পর্যটন শিল্পে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।’
কক্সবাজার জেলা বাস ও মিনিবাস মালিক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম মিয়াজি বলেন, ‘দূরপাল্লার বাসে জ্বালানি সংগ্রহ করতে এখন একাধিক পাম্পে যেতে হচ্ছে। কোথাও চাহিদামতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না। এতে ঈদ যাত্রায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়তে পারে।’
কক্সবাজার ফিশিংবোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘জ্বালানি সংকটের কারণে অনেক ফিশিং ট্রলার সাগরে দীর্ঘ সময় থাকতে পারছে না। এতে মাছ ধরা ব্যাহত হচ্ছে এবং জেলেদের আয়ের ওপর প্রভাব পড়ছে।’
কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ. এম. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে কক্সবাজারের পরিবহণ, পর্যটন ও মৎস্য খাতে এর প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে। বিশেষ করে দ্বীপ ও উপকূলীয় এলাকায় বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা না থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে উঠতে পারে।’