সিলেট: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে প্রয়াত ৩১ জন সংসদ সদস্যের মৃত্যুর শোক প্রস্তাব পাঠ করা হলেও সেখানে নাম নেই সিলেটের কোনো বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবীদ, মন্ত্রী ও প্রভাবশালী সংসদ সদ্যসের। এতে, সিলেট জুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় শুরু হয়েছে। দলমত নির্বিশেষে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক সংঘটনের নেতাকর্মীরা।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশন শুরুতে শোক প্রস্তাব পাঠ করেন স্পিকার আব্দুল হাফিজ।
প্রথম দিনের এই অধিবেশনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াসহ দেশি-বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তি, সাবেক রাষ্ট্রপতি, সারাদেশের বহু সাবেক সংসদ সদস্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহিদ, মৃত্যুতে শোকপ্রস্তাব আনা হলেও সিলেটের কোনো রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, কবি-সাহিত্যিক, গায়ক সমাজসেবক মন্ত্রী-এমপিদের নাম গৃহীত হয়নি। বিশেষ করে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সফল অর্থমন্ত্রীসহ আরও কয়েকজন বর্ষীয়ান পার্লামেন্টারিয়ানের নাম অন্তর্ভূক্ত হয়নি।
সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান
নতুন সরকারের সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট ব্যক্তি মন্ত্রীসহ মোট ৩১ জন সাবেক সংসদ সদস্যের মৃত্যুতে শোক প্রস্তাবে নাম গৃহীত হলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের এক গর্বিত নাম দেশের ইতিহাসে ১২ বারের বাজেট পেশকারী অন্যতম সফল, প্রাজ্ঞ ও দীর্ঘমেয়াদী অর্থমন্ত্রী উন্নয়নের রুপকার এম সাইফুর রহমানের নাম এই সংসদ অধিবেশনে উচ্চারিত হয়নি।
যিনি বিএনপি সরকারের আমলে (জোট সরকার) মুক্তবাজার অর্থনীতি ভ্যাট প্রবর্তন, শিল্পায়ন এবং আর্থিক খাত সংস্কারের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত করেছিলেন।
সাবেক এমপি হারিছ চৌধুরী
শোক প্রস্তাবে নাম গৃহীত হয়নি প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মরহুম হারিছ চৌধুরীর নাম। যিনি ছিলেন বাংলাদেশের একজন রাজনীতিবিদ। যিনি বিএনপি জোট সরকারের আমলে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিএনপির যুগ্ন-মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেন এবং সিলেটের নির্বাচনি আসন জকিগঞ্জ-কানাইঘাট জুড়ে ব্যাপক বিদ্যুৎ ও শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন।
সাবেক এমপি এম ইলিয়াস আলী
সংসদ অধিবেশনে গৃহীত শোক প্রস্তাবে স্বৈরাচারের দোসর মতিয়া চৌধুরী, রমেশ চন্দ্র সেন ও জেনারেল শফিউল্লাহদের নাম উল্লেখ করলেও ভারতের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর নাম শোক প্রস্তাবে পাট করা হয়নি।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও নির্বাচিত সংসদ সদস্য যিনি আপসহীন নেতৃত্ব, ভারতীয় সীমান্ত আগ্রাসন ও টিপাইমুখ বাঁধের বিরুদ্ধে জনমত গঠন এবং দলের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করার জন্য বহুল পরিচিত ছিলেন। তিনি পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ১০১২ সালের এপ্রিল মাসে নিখোঁজ হোন যা বাংলাদেশে গুম ও রাজনৈতিক নির্যাতনের একটি আলোচিত ঘটনা।
সাবেক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট এবাদুর রহমান চৌধুরী
জাতীয় সংসদ অধিবেশনে শোক প্রস্তাবে ঠাঁই হয়নি চারবারের সংসদ সদস্য ও চারদলীয় জোট সরকারের সাবেক প্রতিমন্ত্রী প্রয়াত অ্যাডভোকেট এবাদুর রহমান চৌধুরীর নাম।
বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ বিএনপি জোট সরকারের আমলে খাদ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে তথ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
অ্যাডভোকেট এবাদুর রহমান চৌধুরী বিএনপি সরকারের আমলে তার নির্বাচনি এলাকা মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা ও জুড়ী) আসনে অভূতপূর্ণ উন্নয়ন করেন। শিক্ষা ও যোগাযোগ ক্ষেত্রের তার অবদান আজও জনমনে অম্লান।
একজন আইনজ্ঞ হিসেবে তার খ্যাতি যেমন ছিল আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমাদৃত, তেমনি রাজনীতিবিদ হিসেবেও তিনি ছিলেন দৃঢ় ও বিচক্ষণ।
এ ছাড়াও শোক প্রস্তাবে উচ্চারণ হয়নি সিলেট-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক দিলদার হোসেন সেলিম, যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মরহুম কমর উদ্দিনসহ নিখোঁজ ছাত্রদল নেতা ইফতেখার হোসেন দিনারের নাম।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে পতিত ফ্যাসিস্ট সরকার পরবর্তী সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের দেশ বিদেশে আলোচিত জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সিলেটের এই মহিয়ান রাজনীতিবীদ, মন্ত্রী, সংসদ সদস্যদের নাম গৃহীত না হওয়ায় সিলেটের মানুষের হৃদয়ে গভীর নাড়া দিয়েছে।
দেশ ও গণতন্ত্রের জন্য যাদের অবদান ছিল অনস্বীকার্য অথচ আজকের বাস্তবতায় মনে হচ্ছে—সময়ের প্রবাহে অনেক মহান মানুষের অবদান ধীরে ধীরে আড়াল হয়ে যাচ্ছে এমনটি মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের আহ্বায়ক কবি ও বাচিকশিল্পী সালেহ আহমেদ খসরু—‘শোক অমাবশ্যায়’ বলে কবিতার ছন্দে ফেইসবুকের এক পোস্টে ক্ষোভ জানিয়ে লিখেন—
‘ভাই ওয়াসিম, আমি কেবল কাঁদতে জানি
বদলাতে জানিও না পারার প্রশ্ন কোথায়
আবারও আজ শুধুই কাঁদি কেবল কাঁদি
ভালো থেক জ্বলজ্বল কর অনির্বাণ শিখায়
এইটুকু শিখেছি-বলে দিলাম, এই অমাবশ্যায়।”
বাচিকশিল্পী খসরু বলেন, আমি সিলেটের এই মহিয়ান রাজনীতিবিদদের নিয়ে আর কি বলব; যেখানে বিএনপি ও ছাত্রদল সব সময় শহিদ ওয়াসিমের কথা সামনে আনে। অথচ, সংসদে ছাপানো শোক প্রস্তাবে আবু সাইদ, মুগ্ধ ও আনাসের নাম থাকলেও ওয়াসিমের নাম ছিল না। এটি আমাকে অনেক পীড়া দিয়েছে। যদিও এটা হয়তো ইচ্ছাকৃত নয়। এতে শহিদ ওয়াসিমের মর্যাদা কমেছে তাও নয়। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়!
তিনি ফেইসবুকে আরও লিখেন, গভীর শোক প্রকাশ করছি। চাইলে এখানে আপনারা শোক প্রকাশ করতে পারেন বলে— কয়েকজন রাজনীতিবিদের ছবি দিয়ে ফেইসবুকে একটি পোস্ট করে এ আহ্বান জানান।
শোক প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত না করায় কাতার বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সাবেক উপদেষ্টা শরীফুল হক সাজু ক্ষোভ প্রকাশ করে সারাবাংলার প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, মৌলভীবাজার তথা পুরো সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের একজন ছিলেন বর্ষীয়ান পার্লামেন্টারিয়ান সাবেক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট এবাদুর রহমান চৌধুরী। তিনি মন্ত্রী থাকাকালীন চারদলীয় জোট সরকারের আমলে সিলেটের রাজনীতিতে সুপরিচিত হয়ে উঠেছিলেন শুধুমাত্র তার নির্বাচনি এলাকার রাস্তাঘাটের ব্যাপক উন্নয়ন ও শিক্ষা খ্যাতে নিরব বিপ্লব রচনা করেছিলেন। অভিজ্ঞ ও আইনজ্ঞ প্রবীণ রাজনীতিবিদ হিসেবে দল-মত নির্বিশেষে সবার কাছে সম্মানের পাত্র ছিলেন তিনি। অথচ বহুল আলোচিত জাতীয় সংসদ অধিবেশনে শোক প্রস্তাবে তার নাম গৃহীত হয়নি; এটি শুধুমাত্র জন্ম ভিটা বড়লেখা-জুড়ি নয় পুরো সিলেটবাসীর হৃদয়ে পীড়া দিয়েছে।
বিএনপি নেতা সাজু আরও বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আগামী সংসদ অধিবেশনে সাবেক সফল অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান, নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী, এবাদুর রহমান চৌধুরী, হারিছ চৌধুরীসহ বর্ষীয়ান এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রতি যথাযথ সম্মান জানিয়ে প্রস্তাব গৃহীত হবে বলে আমরা তারুণ্যের অহংকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নতুন সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই।