কক্সবাজার: কক্সবাজারের উখিয়ায় মৃতপ্রায় অবস্থায় উদ্ধার হওয়া এক মহাবিপন্ন বাংলা শকুন দেড় মাসের সেবাযত্নে সুস্থ হয়ে উঠেছে। তবে মুক্ত আকাশে উড়িয়ে দেওয়ার পরও পাখিটি বারবার ফিরে আসছে বন বিভাগের জালিয়াপালং বিট অফিসে। বনকর্মীরা বলছেন, দীর্ঘদিনের পরিচর্যার কারণে পরিচিত আশ্রয়ের টানেই হয়তো পাখিটি আবার ফিরে আসছে।
বনকর্মীরা জানান, গত ১৪ ফেব্রুয়ারি উখিয়ার কোর্টবাজার এলাকায় দুর্বল ও অসুস্থ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায় শকুনটিকে। স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে বন বিভাগের কর্মকর্তা মো. রোকনুজ্জামান রোকন সেটি উদ্ধার করে জালিয়াপালং বিট অফিসে নিয়ে যান। তখন পাখিটির অবস্থা ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। শক্তিহীন দেহ, উড়তে অক্ষম। এমনকি ঠিকমতো দাঁড়াতেও পারছিল না। পরে বিট কর্মকর্তা ও বনকর্মীরা মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে নিয়মিত ওষুধ, পর্যাপ্ত খাবার এবং নিরাপদ পরিবেশে রেখে প্রায় দেড় মাস ধরে নিবিড় পরিচর্যা করেন। ধীরে ধীরে শক্তি ফিরে পেয়ে আবারও ডানা মেলতে সক্ষম হয় বিরল এই পাখিটি।
সম্প্রতি শকুনটিকে মুক্ত আকাশে উড়িয়ে দেওয়া হলে একটি ব্যতিক্রমী দৃশ্য দেখা যায়। কিছু সময় উড়ে বেড়ানোর পর আবারও সেটি ফিরে আসে জালিয়াপালং বিট অফিসে। বনকর্মীদের ধারণা, দীর্ঘদিনের পরিচর্যার ফলে পাখিটির মধ্যে এক ধরনের আস্থা ও অভ্যাস তৈরি হয়েছে। এ কারণেই এটি বারবার পরিচিত আশ্রয়ে ফিরে আসছে।
কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, গবাদি পশুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু বিষাক্ত ওষুধ, বিশেষ করে ডাইক্লোফেনাক ও কেটোপ্রোফেন শকুনের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এসব ওষুধ খাওয়ানো পশুর মৃতদেহ খেলে শকুনের কিডনি বিকল হয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই মৃত্যু ঘটে। এ কারণে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে গত কয়েক দশকে শকুনের সংখ্যা ৯০ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে।
তিনি আরও বলেন, প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা আইইউসিএন বাংলা শকুনকে মহাবিপন্ন প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশে এই প্রজাতির শকুনের সংখ্যা মাত্র প্রায় ২৬০টির মতো বলে ধারণা করা হয়।
ইনানী রেঞ্জ কর্মকর্তা ফিরোজ আল আমিন বলেন, শকুন প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক ঝাড়ুদার। তারা মৃত প্রাণী দ্রুত খেয়ে পরিবেশ পরিষ্কার রাখে এবং বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, উখিয়ার জালিয়াপালং বিটে উদ্ধার হওয়া এই শকুনটির সুস্থ হয়ে ওঠা শুধু একটি পাখির জীবন রক্ষার ঘটনা নয়। বরং মহাবিপন্ন একটি প্রজাতির টিকে থাকার লড়াইয়ে নতুন আশার বার্তা। বনকর্মীদের এই মানবিক উদ্যোগ স্থানীয় মানুষের কাছেও প্রশংসিত হয়েছে।
পরিবেশবাদীরা আশা করছেন, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এমন উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে একদিন হয়তো আবারও বাংলাদেশের আকাশে আগের মতো উড়তে দেখা যাবে এই প্রাকৃতিক ঝাড়ুদার বাংলা শকুনকে।