কুমিল্লা: আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের লাখো মানুষ বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর ও কুমিল্লাসহ অন্তত ১০ জেলার মানুষের প্রধান ভরসা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। আর এই মহাসড়কের কুমিল্লা অংশ প্রায় ১০৫ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত, যা ঈদযাত্রার সময় অতিরিক্ত যানবাহনের চাপে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যাত্রী ও পরিবহন-সংশ্লিষ্টরা মূলত ফুটপাত ও সড়ক দখল, এলোমেলো পার্কিং, মহাসড়কের ওপর বাজার বসা -এ তিনটি বিষয়কে এবারের ঈদের যাতায়াতে প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
সাধারণ সময়ের তুলনায় ঈদের সময় এই মহাসড়কে যাত্রীবাহী যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়ি, মালবাহী ট্রাক ও লরির চাপ। সব মিলিয়ে ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে এই মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে বিশেষ নজরদারির প্রয়োজন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সড়ক ও ফুটপাত দখল, এলোমেলোভাবে যানবাহন পার্কিং, মহাসড়কের ওপর বাজার বসানো এবং চলমান সড়ক সংস্কারকাজ সম্ভাব্য যানজটের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। যাত্রী, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও হাইওয়ে পুলিশের কর্মকর্তারাও এসব সমস্যার কথা স্বীকার করেছেন।

কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার টোল প্লাজার সামান্য পূর্বদিকে বলদাখাল এলাকায় প্রায়ই যানজট লেগে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয়দের মতে, এখান থেকেই চাঁদপুরগামী একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সড়ক বের হওয়ায় যানবাহনের চাপ বেশি থাকে। এছাড়া সিএনজি, মিশুক, অটোরিকশা ও মাইক্রোবাস যত্রতত্র দাঁড় করিয়ে রাখার কারণেও যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে।
এরপর একই উপজেলার গৌরীপুর ও আমিরাবাদ বাসস্টেশন এলাকায় প্রায়ই দুই লেনের মহাসড়কের ওপর বাস ও অন্যান্য যানবাহন পার্কিং করতে দেখা যায়। একই চিত্র দাউদকান্দি, চান্দিনা ও মুরাদনগর—এই তিন উপজেলার সংযোগস্থল ইলিয়টগঞ্জ বাসস্টেশন এবং মুরাদনগর সড়কের মুখেও দেখা যায়।
এছাড়া চান্দিনা উপজেলার মাধাইয়া ও চান্দিনা সদর, বুড়িচং উপজেলার নিমসার, আদর্শ সদর উপজেলার ক্যান্টনমেন্ট সেনানিবাস এলাকা, সদর দক্ষিণের পদুয়ার বাজার ও সুয়াগাজী এবং চৌদ্দগ্রামের মিয়াবাজার ও চৌদ্দগ্রাম সদর এলাকায়ও প্রায়ই যানবাহনের চাপ ও বিশৃঙ্খলা দেখা যায়।
বিশেষ করে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার, চৌদ্দগ্রামের মিয়াবাজার ও চৌদ্দগ্রাম সদরে ফুটপাত দখলের প্রবণতা বেশি। বুড়িচং উপজেলার নিমসার এবং চৌদ্দগ্রাম উপজেলার মিয়াবাজার ও চৌদ্দগ্রাম সদরে মহাসড়কের ওপরই বাজার বসানো হয়, যা যান চলাচলে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে কুমিল্লা সদর উপজেলার আমতলী ও নিশ্চিন্তপুর এলাকায় সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেখানে সংস্কারকাজ চলছে। ফলে এসব স্থানে যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করায় প্রায়ই যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।

সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার এলাকাটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট। এখান দিয়ে ডানে কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক সড়ক অতিক্রম করেছে। একই সড়ক দিয়ে লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুর জেলার পরিবহণও চলাচল করে। ফলে স্বাভাবিক সময়েও এ এলাকায় যানবাহনের চাপ তুলনামূলক বেশি থাকে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পদুয়ার বাজারে ফুটওভার ব্রিজের নিচে প্রায়ই চট্টগ্রামগামী লেনে বাস এলোমেলোভাবে পার্কিং করা হয়। এতে সামনের ইউটার্ন এলাকায় যানজটের সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি ফুটপাত ও সড়কের পাশে ভ্রাম্যমাণ হকার বসায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।
নোয়াখালী সড়কের মুখে ফুটওভার ব্রিজের নিচে বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো এবং মোড়ের একটি মসজিদের সামনে বাসের কাউন্টার স্থাপন করায় প্রায়ই যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে বলে জানান স্থানীয়রা।
ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী যাত্রী আকবর আলী ও রায়হান উদ্দিন বলেন, ‘ফুটপাত দখল, অবৈধ পার্কিং ও মহাসড়কের ওপর বাজার বসার কারণে প্রায়ই যানজট তৈরি হয়। তবে এবার ঈদকে সামনে রেখে হাইওয়ে পুলিশ ও প্রশাসনের বাড়তি নজরদারির কারণে পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তিদায়ক। আমরা ঢাকা থেকে মাত্র দুই ঘণ্টায় কুমিল্লায় পৌঁছেছি।’
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান ঢাকা থেকে নোয়াখালীগামী যাত্রী সোহেল মিয়া, মাসুদ আলম ও সুজন মিয়া। তারা বলেন, প্রশাসনের নজরদারির কারণে এবার তুলনামূলক দ্রুত সময়ে কুমিল্লা পর্যন্ত আসতে পেরেছেন।

তবে চাঁদপুরগামী যাত্রী রুমান ও ফয়সাল ভিন্ন মত প্রকাশ করে বলেন, ‘এখন রাস্তা কিছুটা ফাঁকা মনে হলেও ঈদের দুই-এক দিন আগে প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা যাবে। কুমিল্লা অংশে যেসব জায়গায় সড়ক সংস্কার হচ্ছে, সেখানে নজরদারি না বাড়ালে বড় ধরনের যানজট হতে পারে।’
এ বিষয়ে হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা অঞ্চলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহিনুর আলম খান বলেন, ‘প্রতি বছর ঈদকে কেন্দ্র করে ঘরমুখো মানুষের চাপ বাড়ে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশ প্রায় ১০৫ কিলোমিটার, আর এই অংশ দিয়েই কুমিল্লাসহ আরও ৯ জেলার মানুষ বাড়ি ফেরে।’
তিনি বলেন, ‘ঈদযাত্রা স্বস্তিদায়ক করতে আমরা আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়েছি। হাইওয়ে পুলিশ, বাস মালিক সমিতি, বাজার কমিটি ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে মহাসড়কের সম্ভাব্য যানজটের কারণগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি স্থানে ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, সবার সহযোগিতায় এবারের ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, ঘরমুখো মানুষ নিরাপদ ও স্বস্তিদায়কভাবে নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন।