Friday 20 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

আরাকান আর্মির হাতে বন্দি স্বজন
ঈদ আনন্দ নেই নাফ নদীর পাড়ে

ইমরান হোসাইন, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২০ মার্চ ২০২৬ ১৫:১১ | আপডেট: ২০ মার্চ ২০২৬ ১৫:১৪

টেকনাফের একটি বাড়িতে স্বজনহারা নারী।

কক্সবাজার: চারদিকে উৎসবের আমেজ। একদিন পর ঈদুল ফিতর। নতুন পোশাক, কেনাকাটা, আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা, শিশুদের হাসি। কক্সবাজারের টেকনাফেও তার ব্যতিক্রম নেই। কিন্তু, এই আনন্দের মাঝেই টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের জালিয়াপাড়ার কয়েকটি ঘরে নিঃশব্দে নেমে এসেছে শোক। সেখানে নেই ঈদের কোনো প্রস্তুতি, নেই নতুন কাপড়, নেই হাসির শব্দ। আছে শুধু সীমান্তের ওপার থেকে স্বজনের ফিরে আসার অপেক্ষা।

এই পরিবারগুলোর কারো স্বামী, কারো ভাই, কারো আদরের সন্তান এখন বন্দি মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হাতে।

ঈদের আগে শূন্য হয়ে যাওয়া ঘর

শাহপরীর দ্বীপের সরু গলিপথে ঢুকলেই চোখে পড়ে উদ্বেগ আর বিষণ্নতার ছাপ। ছোট ছোট টিনের ঘর, দরজার সামনে বসে থাকা নারী ও শিশু। তাদের চোখে অনিশ্চয়তা, অপেক্ষা আর অশ্রু। অন্য ঘরে যখন ঈদের কেনাকাটার ব্যস্ততা, তখন এই ঘরগুলোতে চলছে দিন গোনা। কবে ফিরবে প্রিয়জন ? আদৌ ফিরবে কি ?

বিজ্ঞাপন

শিশুরা এখনো পুরোটা বুঝে উঠতে পারেনি। তারা জানে না, এবারের ঈদে বাবার হাত ধরে নামাজে যাওয়া হবে না, নতুন জামা কিনে দেওয়ার কেউ নেই। ক্যামেরা দেখলে তারা হাসে। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক গভীর শূন্যতা।

যেদিন থেকে শুরু হলো দুঃস্বপ্ন

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি মাছ ধরে ফেরার পথে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের মিলনস্থল নাইক্ষ্যংদিয়া এলাকা থেকে পাঁচ জেলেকে অপহরণ করে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি। অপহৃতরা হলেন শাহ আলম, মোহাম্মদ ইউনুস, আবুল হোসাইন, আব্দু সাহেদ ও মোহাম্মদ আব্বাস। তাদের সবার বাড়ি টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের শাহপরীর দ্বীপের জালিয়াপাড়ায়। সেদিনের পর থেকে তাদের পরিবারের জীবনে শুরু হয়েছে এক দীর্ঘ অন্ধকার অধ্যায়।

‘আমার স্বামী বেঁচে আছেন কিনা জানি না’

‘মাত্র দুই বছর আগে আমাদের সংসার গড়ে উঠেছিল। এখন সেই সংসার ভেঙে পড়ার পথে,’ কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন অপহৃত জেলে শাহ আলমের স্ত্রী নূর কলিমা।

তিনি বলেন, “আমার স্বামী বেঁচে আছেন কিনা, সেটাও জানি না। প্রতিটি দিন কাটে দুশ্চিন্তায়, রাতে ঘুম হয় না।”

তার চোখের নিচে কালি, মুখে ক্লান্তি। অপেক্ষা আর অনিশ্চয়তার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি এই নারী।

রমজানজুড়ে অনিশ্চয়তা

পুরো রমজান মাসজুড়ে এই পরিবারগুলোর দিন কেটেছে চরম অনিশ্চয়তা আর কষ্টে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বন্দি থাকায় অনেকেই অর্ধাহার-অনাহারে দিন পার করছেন।

স্বজন মো. রশিদ বলেন, ‘আগে প্রতিদিন মাছ ধরে যা আয় হতো, তা দিয়ে সংসার চলত। এখন ঘরে খাবার জোটানোই কঠিন হয়ে গেছে।’

ঈদকে ঘিরে যখন অন্য পরিবারগুলো বাজারে যাচ্ছে, নতুন কাপড় কিনছে তখন এই পরিবারগুলোর কাছে ঈদ মানে শুধু একটি তারিখ। যার সঙ্গে কোনো আনন্দ জড়িয়ে নেই।

বন্দি জেলেদের মানবেতর জীবন

শাহপরীর দ্বীপ জেলে সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুল গনি জানান, এখনও বাংলাদেশি ১৩০ জেলে মায়ানমারে আটক আছেন। অপহৃত কয়েকজন জেলের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘তারা খুব কষ্টে আছে। মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে।’

তিনি আরও জানান, জেলেরা দ্রুত দেশে ফিরতে চায়। পরিবারের সদস্যদের জন্য তারাও উদ্বিগ্ন। আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাই, দ্রুত তাদের উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক। নাফ নদীতে জেলেদের স্থায়ী নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা হোক।’

বন্ধ হচ্ছে না অপহরণ

এই একটি ঘটনার পরও থেমে নেই অপহরণ। সর্বশেষ গত ১৭ মার্চ সকালে টেকনাফ উপকূল থেকে আরও চার জেলেকে নৌকাসহ ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি। এই ধারাবাহিক ঘটনায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পুরো জেলে সম্প্রদায়ের মধ্যে। অনেকেই এখন জীবিকার তাগিদে নদীতে যেতে ভয় পাচ্ছেন।

জেলে শফি আলম বলেন, ‘নদীতে গেলে জীবনের ঝুঁকি, না গেলে পরিবারের খাবার জোটে না। আমরা যাব কোথায় ?’

সীমান্তের বাস্তবতা: জীবিকার সঙ্গে ঝুঁকির লড়াই

টেকনাফের জেলেদের জীবিকা মূলত নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক। প্রতিদিন ভোরে তারা মাছ ধরতে যায়, সন্ধ্যায় ফিরে আসে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত এলাকায় অস্থিতিশীলতা বেড়েছে। বিশেষ করে মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলের সংঘাত পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে এই এলাকায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীমান্তে কার্যকর নজরদারি ও সমন্বয়ের অভাব থাকায় জেলেরা সহজেই অপহরণের শিকার হচ্ছেন।

অপেক্ষা পর অপেক্ষা

শাহপরীর দ্বীপের ঘরগুলোতে এখন সময় যেন থমকে আছে। প্রতিটি দিন কাটে একই প্রশ্ন নিয়ে, আজ কি কোনো খবর আসবে? একটি ঘরে দেখা গেল, ছোট একটি ছেলে বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছে। হয়ত সে অপেক্ষা করছে, বাবা আসবে। কিন্তু কেউ তাকে বলতে পারে না, সেই অপেক্ষা কত দীর্ঘ।

তবুও প্রশ্ন রয়ে যায়

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্য সচিব এইচ. এম. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এই ঘটনা শুধু কয়েকটি পরিবারের ব্যক্তিগত বেদনা নয়। এটি একটি বড় প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে আর কতদিন জীবিকার তাগিদে নদীতে গিয়ে এভাবে অপহরণের শিকার হবেন জেলেরা ? আর কত পরিবার হারাবে তাদের স্বাভাবিক জীবন ? কত দীর্ঘ হবে এই অপেক্ষা ?

ঈদ এসেছে, আনন্দ আসেনি

ঈদ আসবে, মানুষ নতুন কাপড় পরবে, নামাজ পড়বে, আনন্দ করবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু টেকনাফের এই কয়েকটি ঘরে ঈদ মানে অন্য কিছু। তাদের কাছে ঈদ মানে অপেক্ষা, অশ্রু আর অনিশ্চয়তা।

স্থানীয় সামাজিক সংগঠন ‘আমরা কক্সবাজারবাসী’ এর সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দীন বলেন, ‘এখানে নেই হাসি, নেই উৎসবের রং। আছে শুধু একটাই চাওয়া, প্রিয়জন ফিরে আসুক। ঈদ এসেছে, কিন্তু এই ঘরগুলোতে এখনো ফেরেনি ঈদের আনন্দ।’

বিজিবি’র আশ্বাস

বিজিবির রামু সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, বিভিন্ন সময়ে ধরে নিয়ে যাওয়া জেলেদের মধ্যে ৭৩ জনকে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ফেরত আনা হয়েছে। আরাকান আর্মি ওই ৭৩ জেলেকে শূন্যরেখায় হস্তান্তর করে। তাদের হাতে আটক থাকা অন্য জেলেদের ফেরত আনার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে বিজিবি।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর