রংপুর: রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের অন্দরে শনিবার ঈদের সকাল। ফাঁসির প্রতীক্ষায় থাকা কেউ, বছরের পর বছর সাজা ভোগ করা কেউ, আবার বিচারাধীন মামলায় আটক অনেকে। প্রিয়জনদের থেকে মাইলের পর মাইল দূরে। তবু সকাল সাড়ে ৮টায় কারা অভ্যন্তরের মাঠে যখন ঈদের জামাত শুরু হলো, তখন সেই নীরব বেদনার মাঝেই ফুটে উঠল এক অপূর্ব আনন্দের ছবি। নতুন পোশাকে সজ্জিত ১২শ বন্দি একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করলেন, চোখের জলে ভাগ করে নিলেন হারানো ঈদের স্মৃতি। কারা কর্তৃপক্ষের ব্যতিক্রমী আয়োজনে এবার তাঁদের মুখে ফুটেছে হাসি—যেন এক মুহূর্তের জন্যও ভুলিয়ে দিয়েছে জীবনের অন্ধকার।
দেশের ৭৩টি কারাগারে প্রায় ৭৮ হাজার ৫০০ বন্দির মতোই রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারেও এবার ঈদ হয়েছে স্মরণীয়। কারা মহাপরিদর্শকের নির্দেশে সকাল থেকেই শুরু হয়েছে বিশেষ আয়োজন। ভোরে বন্দিরা নতুন পোশাক পরে মাঠে সমবেত হয়েছেন। সাড়ে ৮টায় কারা অভ্যন্তরে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়—কারা কর্মকর্তারাও অংশ নেন। নামাজ শেষে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কুশল বিনিময়, হাসি-কান্নায় মিশে যায় সব দূরত্ব।
দুপুরের খাবারে ছিল রাজকীয় আয়োজন। সকালে পায়েশ ও মুড়ি, দুপুরে পোলাও, মুরগির রোস্ট, গরু ও খাসির মাংস, সালাদ, মিষ্টি, কোমল পানীয় আর পান-সুপারি। রাতে সাদা ভাত, রুই মাছ ও আলুদম। এই খাবার শুধু পেট ভরায়নি, ভরিয়েছে হৃদয়ও।
সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী ছিল স্বজনদের সঙ্গে দেখা। কারাগারে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে ফুলের তোড়া দিয়ে বরণ করা হয়েছে প্রত্যেক স্বজনকে। কোমল পানীয়, বসার ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম উষ্ণতা। ভারপ্রাপ্ত জেলার শাখাওয়াত হোসেন জানান, “কারা মহাপরিদর্শকের নির্দেশে বন্দিদের স্বজনরা বাড়ির তৈরি পছন্দের খাবার দিতে পারবেন, দেখা করতে পারবেন। বোনাস হিসেবে মোবাইলে ৫ মিনিট অতিরিক্ত কথা বলার সুযোগও দেওয়া হয়েছে।”
সিনিয়র জেল সুপার এ.এস.এম কামরুল হুদা বলেন, “ঈদ উপলক্ষে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি যেন বন্দিরা এক মুহূর্তের জন্যও পরিবারের অভাব অনুভব না করেন। উন্নতমানের খাবার, নামাজ, কোলাকুলি—সবকিছুতেই আমরা তাদের পাশে থেকেছি।”
নীলফামারী থেকে আসা আফরোজা ইসলাম স্বামী সামসুলকে দেখতে একমাত্র মেয়ে রাইতাকে নিয়ে এসেছিলেন। চোখে অশ্রু নিয়ে বলেন, “এত সুন্দর আয়োজন দেখে মনে হচ্ছে আমার স্বামী একা নয়। ফুল দিয়ে বরণ, সরবত—কখনো ভাবিনি কারাগারেও এমন উষ্ণতা পাব।”
রহিমা বেগম পীরগঞ্জ থেকে এসেছিলেন একমাত্র ছেলেকে দেখতে। ১৩ মাস ধরে আটক ছেলের জন্য বিরিয়ানি নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু ছেলে বলেছে, “মা, এবার কারাগার থেকেই ভালো খাবার দিয়েছে।” রহিমা বলেন, “আগে আসলে কত কষ্ট হতো। এবার যেন স্বপ্নের মতো লাগছে।”
কারাগারে দুই শতাধিক রাজনৈতিক বন্দিও এই আনন্দে শরিক হয়েছেন। অনেক স্বজন এসেছিলেন, কিন্তু কথা বলতে চাননি। তবু তাঁদের চোখের ভাষায় ছিল একই কথা—“আমাদের ভাই-ছেলেরা একা নয়।”
রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে এই আয়োজন শুধু একটি জেলের ঘটনা নয়। এটি দেশজুড়ে কারা অধিদফতরের এক বড় উদ্যোগের অংশ—যেখানে ফাঁসির প্রতীক্ষায় থাকা, সাজাপ্রাপ্ত ও বিচারাধীন সবাইকে একটু আলো দেওয়ার চেষ্টা। ঈদের এই দিনে যারা কারাগারের অন্ধকারে বসে আছেন, তাঁদের জন্য এই ছোট ছোট আয়োজন হয়ে উঠেছে বিশাল আশার আলো।