বাগেরহাট: ঈদের আনন্দ যেন এবার ছড়িয়ে পড়েছে গাছের পাতায়, নদীর জলে আর বাতাসের মৃদু ছোঁয়ায়। শহরের কোলাহল ছেড়ে হাজারো মানুষ ছুটে এসেছেন প্রকৃতির কাছে—বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে। নদীর বুকে লঞ্চ, জ্বালিবোট ও নৌকায় ভাসিয়ে কেওড়া-গরান-সুন্দরী গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে মানুষ খুঁজে নিচ্ছেন এক টুকরো প্রশান্তি। বনের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নোনা হাওয়ায় মিশে আছে এক অদ্ভুত শান্তি—যা শহুরে জীবনে দুর্লভ। পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সেবায় নিরলসভাবে কাজ করছে বনবিভাগ ও ট্যুরিস্ট পুলিশ। ছুটির পুরো সময় জুড়ে তাদের তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে।
ঈদের ছুটিতে ৭ দিন এবং ২৬ মার্চ সঙ্গে শুক্রবার ও শনিবারের ছুটি সব মিলে ১০ দিনের ছুটিতে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে নেমেছে পর্যটকদের ঢল। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে প্রকৃতির টানে ছুটে আসছেন হাজারো ভ্রমণপিয়াসী। সবুজে ঘেরা বন, নদীর নোনা পানি আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে মুখর হয়ে উঠেছে সুন্দরবনের পর্যটন স্পটগুলো। বিশেষ করে করমজলে পর্যটকদের ভিড় সবচেয়ে বেশি। মোংলা হয়ে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে দেশের যেকোনো স্থান থেকে এখানে আসা এখন অনেক সহজ।
করমজলের পাশাপাশি হাড়বাড়ীয়া, কটকা, কচিখালী ও আন্ধারমানিক-সহ অন্যান্য স্পটেও উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। বিলাসবহুল লঞ্চে চড়ে নদী আর বন ঘুরে দেখছেন নানা বয়সের পর্যটকরা। হরিণের নির্ভীক চলাফেরা, পাখির কিচিরমিচির আর সবুজের অনন্ত বিস্তার যেন মুহূর্তেই মুগ্ধ করে দিচ্ছে আগতদের। কেউ ছবি তুলছেন, কেউবা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য অনুভব করছেন। কোথাও নদীর ঢেউ তীরে আছড়ে পড়ছে, কোথাও আবার বনভূমির গভীরে নেমে এসেছে নীরবতা—যেন প্রকৃতি নিজেই কথা বলছে মানুষের সঙ্গে। বিলাসবহুল লঞ্চের ডেকে দাঁড়িয়ে কেউ সূর্যাস্ত দেখছেন, কেউ নদীর বুক চিরে এগিয়ে চলা পানির শব্দে হারিয়ে যাচ্ছেন। পরিবার, বন্ধু আর প্রিয়জনদের সঙ্গে এই ভ্রমণ যেন শুধু আনন্দ নয়—প্রকৃতির সঙ্গে এক গভীর সংযোগের অনুভূতি।
ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে সুন্দরবনে ঘুরতে এসে খুব ভালো লাগছে। প্রকৃতির এই সৌন্দর্য সত্যিই অসাধারণ।
বগুড়া থেকে আসা মো. আসলাম জানান, সপরিবারে তারা সুন্দরবন ভ্রমণে এসেছেন।
যশোর থেকে আসা মোসাম্মদ বিলকিস বেগম জানান, কুমির, হরিণ, বানর দেখে ভালোই লেগেছে। তবে তার আফসোস তিনি বাঘকে দেখতে পাননি।
ডেনিস বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ফরিদ খলিফা বলেন, ৩ হাজার বোট আগত পর্যটকদের সেবা দিয়ে যাচ্ছি। তারা যাতে নিরাপদে সুন্দরবন ঘুরতে পারে এবং নিরাপদে ফিরে আসে সে দিকে আমরা লক্ষ্য রাখছি।
ট্যুরিস্ট পুলিশের সুন্দরবন জোনের মুখপাত্র ব্রজ কিশোর পাল জানান, দেশি-বিদেশি আগত পর্যটকদের নিরাপত্তায় কাজ করছি। বোটে যাতে বেশি যাত্রী উঠতে না পারে এবং লাইফ জ্যাকেট পরা বাধ্যতামূলক করাসহ তাদের নিরাপত্তায় কাজ করছে ট্যুরিস্ট পুলিশ।
সুন্দরবনের করমজল পর্যটন কেন্দ্রর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, এবারের ঈদে পর্যটকের আগমন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। ঈদের ছুটিতে এবার পর্যটকের সংখ্যা আগের চেয়ে অনেক বেশি। আমরা তাদের নিরাপত্তা ও সেবার জন্য সার্বক্ষণিক কাজ করে যাচ্ছি।
তিনি আরও জানান, শুধু করমজলে দেশি-বিদেশি মিলে প্রায় ১১ হাজার পর্যটক ভ্রমণ এসেছে।
সব মিলিয়ে ঈদের এই ছুটিতে প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর হয়ে উঠেছে সুন্দরবন।