রাজশাহী: জুলাই যোদ্ধাদের দাবির মুখে গোদাগাড়ী উপজেলা প্রেসক্লাব বন্ধ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজমুস সাদাত রত্ন।
শনিবার (২৮ মার্চ) সকালে প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার উপজেলা প্রতিনিধি সাইফুল ইসলামকে ডেকে তিনি এ পরামর্শ দেন।
সাংবাদিকরা বলছেন, প্রেস ক্লাব কার্যালয়ে জুলাইযোদ্ধাদের নতুন সংগঠন ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জুলাইযোদ্ধা’-এর কার্যালয় বানানোর জন্য এমন তৎপরতা চালাচ্ছেন তারা।
অন্যদিকে এরূপ হস্তক্ষেপ স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকি উল্লেখ করে প্রতিবাদ করেছেন সাংবাদিকরা। তারা বলছেন, প্রেসক্লাব চলে সাংবাদিকদের নিজস্ব নিয়মে। এখানে সরকারি কিংবা যে কোনো হস্তক্ষেপ স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকি। সাংবাদিকরা ইউএনওর এমন নির্দেশের নিন্দা এবং তাকে এই অবস্থান থেকে সরে আসার আহ্বান জানান।
এ বিষয়ে প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, গত ২৬ মার্চ সন্ধ্যায় তারা প্রেস ক্লাবে বসেছিলেন। এ সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা কমিটির সাবেক সদস্য সচিব মো. রহমতুল্লাহ ও সাবেক ছাত্রদল নেতা ফরহাদসহ কয়েকজন যান। তারা জানান, প্রেস ক্লাবের ব্যাপারে ইউএনওর কাছে অভিযোগ করা হয়েছে। সেই অভিযোগের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তারা যেন প্রেস ক্লাব না খোলেন। সেই থেকে নিরাপত্তার সংকটে সাংবাদিকরা প্রেস ক্লাবে বসতে পারেননি।
সাইফুল ইসলাম আরো বলেন, প্রেস ক্লাব দখলের চেষ্টার বিষয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। এতে আরও চটেছেন ইউএনও এবং জুলাইযোদ্ধারা। এখন জুলাইযোদ্ধারা নিজেদের অফিস করার দাবি থেকে সরে এসে প্রেস ক্লাব গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখানে পাবলিক টয়লেট কিংবা যাত্রী ছাউনি করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।
ইউএনও’র প্রেস ক্লাব বন্ধের কথা তুলে ধরে প্রেস ক্লাব সভাপতি বলেন, শনিবার সকালে ইউএনও নাজমুস সাদাত রত্ন আমাকে ডেকে পাঠান। এবং প্রেস ক্লাব বন্ধ রাখার পরামর্শ দেন। আর এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ করা ‘ঠিক হয়নি’ বলেও আমাকে জানান ইউএনও। তিনি বলেছেন, জুলাইযোদ্ধাদের সরকারও ভয় পায়। সেখানে তাদের সঙ্গে মীমাংসা করে নেওয়াই ভালো হবে।
‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জুলাইযোদ্ধা’র সভাপতি সাবিয়ার রহমান মিল্টন জানিয়েছেন, গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই জুলাই আন্দোলনের আহতরা প্রেস ক্লাবে নিজেদের অফিস করতে চাচ্ছিলেন। তিনি ইতোমধ্যে কয়েকদফা সেই উদ্যোগ ঠেকিয়েছিলেন।
ইউএনওর এমন পরামর্শের নিন্দা জানিয়ে রাজশাহী এডিটরস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব অপু বলেন, ‘প্রেস ক্লাব সাংবাদিকদের নিজস্ব নিয়মে চলে। এখানে যে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপই স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। ইউএনও সরকারি কর্মকর্তা। তাই তার এমন পরামর্শ সরকারকে নিয়ে ভুল বার্তাও ছড়াতে পারে।’
জানতে চাইলে ইউএনও নাজমুস সাদাত রত্ন বলেন, ‘প্রেস ক্লাবের সভাপতির সঙ্গে আমার এ বিষয়ে কথা হয়েছে। কিন্তু প্রেস ক্লাব বন্ধ রাখার পরামর্শ ওইভাবে দেওয়া হয়নি।’ কী পরামর্শ দেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে ইউএনও বলেন, ‘অফিসে আসেন। সামনাসামনি বলব।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা কমিটির সাবেক সদস্য সচিব মো. রহমতুল্লাহ বলেন, ‘প্রেস ক্লাব আছে সরকারি জায়গায়। সাংবাদিরা কেন সরকারি জায়গায় বসবে? অন্য কোনো জায়গায় প্রেস ক্লাব করলে প্রয়োজনে আমি ভাড়া দেব। কিন্তু এই প্রেস ক্লাব রাখব না।’
তিনি অভিযোগ করেন, এই প্রেস ক্লাব থেকে স্বৈরাচারের আমলে অনেক খারাপ কাজ হয়েছে। জঙ্গি নাটক সাজানো হয়েছে। এই প্রেস ক্লাবের ওপর সাধারণ মানুষের অভিশাপ আছে।
এর আগে ২০১০ সালে একটি সংবাদ নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আতাউর রহমান খানের নির্দেশে তার দলীয় কর্মীরা প্রেস ক্লাবে তালা মেরে বন্ধ রেখেছিলেন। পরে প্রেস ক্লাবটি আবার চালু হয়।
২০১৩ সালে বিএনপির প্রয়াত ভাইস চেয়ারম্যান ও মন্ত্রী মরহুম ব্যারিস্টার আমিনুল হক প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এই ক্ষোভে এলাকার তৎকালীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ওমর ফারুক চৌধুরীর নির্দেশে বুলডোজার দিয়ে প্রেসক্লাবটি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরের বছর সংস্কার করে পুনরায় প্রেস ক্লাবটি চালু করা হয় ।
এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের দিন আগুন দিয়ে প্রেস ক্লাবটি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। দীর্ঘ ১৯ মাস বন্ধ থাকার পরে সংস্কার করে চলতি মাসে প্রেস ক্লাবটি চালু করা হয়।