ইবি: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) সমাজকল্যাণ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা হত্যাকাণ্ডের পর অচল হয়ে পড়েছে বিভাগটি। শিক্ষক শূন্যতায় বন্ধ হয়ে আছে ক্লাস-পরীক্ষা, তৈরি হয়েছে চরম অ্যাকাডেমিক সংকট।
শনিবার (২৮ মার্চ) পবিত্র মাহে রমজান ও ঈদুল ফিতরের ছুটি শেষে অন্যান্য বিভাগে ক্লাস-পরীক্ষার কার্যক্রম শুরু হলেও এ বিভাগে নেমে এসেছে নীরবতা, বিরাজ করছে হাহাকার।
বিভাগটির চারজন শিক্ষকের মধ্যে খুনের শিকার হন সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা, শিক্ষা ছুটিতে বিদেশে আছেন মমতা মোস্তারী, এছাড়া অপর দুই শিক্ষক শ্যাম সুন্দর ও হাবিবুর রহমান ফৌজদারি মামলার আসামি হওয়ার কারণে বিভাগে আসছেন না। বিভাগটি এখন একেবারেই শিক্ষক শূন্য হয়ে পড়ায় চরম হাহাকার বিরাজ করছে বিভাগটিতে।
বিভাগের শিক্ষার্থীরা বলেন, রুনা ম্যাম আমাদের বিভাগকে এগিয়ে নিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন। ম্যামের শূন্যতা কখনো পূর্ণ হবার নয়। ম্যামের হত্যার সাথে যারা জড়িত তাদেরকে অতিদ্রুত সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানাই। আজকে অন্যান্য বিভাগের মতো আমাদেরও ক্লাস-পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আজ আমাদের বিভাগ শূন্য পড়ে আছে। আমরা অতিদ্রুত শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে অ্যাকাডেমিক সংকট দূর করার দাবি জানাই। শিক্ষক নিয়োগের পূর্ব পর্যন্ত অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়ে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনার দাবি জানাচ্ছি।
বিভাগের শিক্ষার্থী বাঁধন বিশ্বাস স্পর্শ বলেন, ম্যামের হত্যার সঙ্গে জড়িতদের অতিদ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাই, যাতে পরবর্তীতে এমন কাজ করার সাহস কেউ না পায়। ম্যামকে হত্যার পর আমাদের বিভাগের কার্যক্রম স্তব্ধ হয়ে আছে। আমরা চাই অতিদ্রুত শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে শিক্ষক সংকট দূর করা হোক। সেই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যেন ম্যামের পেনশনের টাকা অতিদ্রুত পরিশোধ করে সেই দাবি জানাই।
সাকিব আল হাসান নামের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ম্যামের শূন্যতা সত্যিই অপূরণীয়। আজ সকাল ১০টার বাসে এসে বিভাগে তালা দেওয়া দেখেছি, পরবর্তীতে ১১টার পর তালা খোলা হয়েছে। অথচ ম্যাম দায়িত্বে থাকাকালীন সময়ে প্রতিদিন ৯টা থেকে বিভাগের কার্যক্রম শুরু হতো। আমাদের দুইটি ব্যাচের সেমিস্টার পরীক্ষা চলমান ছিল, সেগুলো বর্তমানে বন্ধ আছে। আমরা এই হত্যার সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানাই। সেই সাথে বিভাগের ক্লাস-পরীক্ষা চালুর জন্য প্রশাসনকে অতিদ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।
এ বিষয়ে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. বেগম রোকসানা মিলি বলেন, আজকে বিভাগে গিয়ে যাবতীয় কাগজপত্র খুঁজতে গিয়ে অনেক ডকুমেন্টস খুঁজে পাইনি। বর্তমানে বিভাগটি শিক্ষক শূন্য থাকার ফলে চরম সংকট তৈরি হয়েছে। বাহিরের যে-সকল শিক্ষক ক্লাস নিতেন তাদের সাথে কথা বলে দ্রুতই ক্লাস-পরীক্ষা চালুর ব্যবস্থা করবো। যাতে শিক্ষার্থীদের কোন ক্ষতি না হয়।
ইবি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মাসুদ রানা বলেন, মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান। আমরা এখন পর্যন্ত আসামি ফজলুর রহমানকে গ্রেফতার করেছি। সেই সাথে বাকী তিনজন আসামি যেন দেশের বাহিরে যেতে না পারে সেই ব্যবস্থা নিয়েছি।
এদিকে ঘটনার পর দিন ৫ মার্চ নিহত শিক্ষিকার স্বামী ইমতিয়াজ সুলতান বিভাগের সাবেক কর্মচারী ফজলুর রহমানসহ চারজনকে আসামি করে এজাহার দায়ের করেছেন।
এজাহারে অন্তর্ভূক্ত অপর তিন আসামি হলেন—বিভাগটির সাবেক সহকারী রেজিস্ট্রার ও বর্তমান উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা সিদ্দিকা হলের সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিত কুমার বিশ্বাস, বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার ও সহকারী অধ্যাপক হাবিবুর রহমান।
মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০১৮ সালে ফজলুর রহমান সমাজকল্যাণ বিভাগের বিভাগীয় তহবিল থেকে অফিস সহায়ক পদে নিয়োগ পান। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আসমা সাদিয়া বিভাগের সভাপতি হন। আগের সভাপতি শ্যাম সুন্দর তার সময়ের বিভাগের আয়-ব্যয়ের হিসাব আসমাকে বুঝিয়ে দেননি।
সহকারী রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার আসমা সাদিয়াকে বলেন, তারা যেভাবে বলবেন এবং কাগজ সামনে ধরবেন, সেখানে তাকে শুধু সই করতে হবে। সে সময় আসমা বিভাগের টাকা স্বচ্ছতার ভিত্তিতে খরচ ও অপব্যবহার করা যাবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। তখন থেকেই আসমার সঙ্গে বিশ্বজিৎ ও শ্যাম সুন্দরের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। বিশ্বজিৎ ও শ্যাম সুন্দর মিলে অফিস সহায়ক ফজলুরকে দিয়ে আসমাকে বিভিন্ন সময়ে অসহযোগিতা ও হেনস্তা করতে থাকেন। এরপর শিক্ষক হাবিবুর রহমানের সামনে আসমাকে ফজলুর অপমানজনক শব্দ ও অশালীন আচরণ করলেও হাবিবুর কোনো প্রতিবাদ করেননি।
তিনি আরও বলেন, আসমা এসব ঘটনা সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন রোকসানা মিলিকে মৌখিকভাবে অবহিত করলে ডিনের নির্দেশে বিভাগে সভাও হয়। একপর্যায়ে কয়েক মাস আগে ডিনের নির্দেশে বিভাগীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও বিভাগীয় সভাপতিকে অসহযোগিতা করায় ফজলুরকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলি করা হয়। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে শিক্ষক হাবিবুর ফজলুরকে পুনরায় সমাজকল্যাণ বিভাগে আনতে আসমাকে চ্যালেঞ্জ করেন। অন্যদিকে বিভাগের কর্মকর্তা বিশ্বজিৎকে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বদলি করা হয়। ওই বিভাগে তার স্থলে যোগদানকৃত নতুন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে আসমা তাকে মোবাইল ফোনে অনুরোধ করলেও তিনি দায়িত্ব বুঝিয়ে দেননি।
উল্লেখ্য, গত ৪ মার্চ বিকেল চারটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদ ভবনের সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনাকে ছুরিকাঘাত করে আত্মহননের চেষ্টা করেন একই বিভাগের সাবেক কর্মচারী ফজলুর রহমান। খবর পেয়ে প্রক্টরিয়াল বডি ও ইবি থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে উভয়ের রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার করে। পরে তাদেরকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে পাঠানো হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক শিক্ষিকা আসমা সাদিয়া রুনাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পরদিন বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় ময়নাতদন্ত করা হয়। পরে বাদ জোহর কুষ্টিয়ার কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে জানাজা শেষে কুষ্টিয়া কেন্দ্রীয় পৌর গোরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।