রংপুর: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) ক্যাম্পাসে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্মারক ‘স্বাধীনতা স্মারক’ নির্মাণ শুরুর ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনও অসম্পূর্ণ। যদিও এরই মধ্যে শেষ হয়েছে পাঁচ উপাচার্যের মেয়াদকাল। তবুও এই গুরুত্বপূর্ণ স্মারকটির কাজ শেষ করা যায়নি, যা শিক্ষার্থী ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দফতর জানায়, স্মারকটির নকশায় রয়েছে ১১ হাজার ৬৯৬ বর্গফুটের বিশাল ভিত্তি, তিনটি পাথরের স্তম্ভ, যা দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ ও আত্মত্যাগের প্রতীক। এই তিন স্তম্ভকে যুক্ত করবে ২০ ফুট লম্বা টানেল আকৃতির ছাউনি, যা মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষের ঐক্য ও যৌথ সংগ্রামকে প্রতিফলিত করবে। স্তম্ভগুলোতে খোদাই করা থাকবে যুদ্ধকালীন স্মৃতি এবং পেছনে থাকবে ম্যুরাল।
রেজিস্ট্রার অফিস সূত্রে জানা গেছে, স্বাধীনতা স্মারকটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১২ সালের ডিসেম্বরে, তৎকালীন উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. আবদুল জলিল মিয়ার সময়ে। জনতা ব্যাংকের অর্থায়নে প্রকল্পটি শুরু হয় এবং ২০১৩ সালের ২৮ নভেম্বর তৎকালীন উপাচার্য প্রফেসর ড. এ কে এম নূর-উন-নবী ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। কিন্তু কাজ শুরুর কিছুদিন পরই থেমে যায়। পরবর্তী উপাচার্য প্রফেসর ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহর আমলে ফের স্মারক নির্মাণ শুরু হয়।
স্বাধীনতা স্মারকটি নির্মাণে প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। পরে উপাচার্য কলিমউল্লাহ ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকায় বাড়ানোর প্রস্তাব করেন। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইউজিসির মাধ্যমে তদন্তের নির্দেশ দেয়। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা মিললে মন্ত্রণালয় স্বাধীনতা স্মারকসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি বড় প্রকল্প (স্বাধীনতা স্মারক, গবেষণা ইনস্টিটিউট ও ১০ তলা ছাত্রী হল) স্থগিত করে দেয়। পরবর্তী সময়ে প্রফেসর ড. হাসিবুর রশীদ উপাচার্য হয়ে এলেও স্থগিত কাজগুলো চালু করতে কোনো উদ্যোগ নেননি।
জুলাই আন্দোলনের পর শিক্ষার্থীদের চাপে দীর্ঘদিন স্থবিরতার পর সম্প্রতি গবেষণা ইনস্টিটিউট ও ছাত্রী হলের কাজ ফের শুরু হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতা স্মারকের কাজ এখনও শুরু হয়নি। বর্তমান উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. শওকত আলী সারাবাংলাকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ৭৭ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ পেয়েছে। এই অর্থে ছাত্রী হল ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের কাজ চলবে। ঠিকাদারের কাছে কিছু টাকা রয়েছে। স্বাধীনতা স্মারকের বাকি কাজ ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হবে।’
উপাচার্যের এমন আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা অবশ্য আশাবাদী। অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের শিক্ষার্থী গাজী আজম সারাবাংলাকে বলেন, ‘বর্তমান প্রশাসন অনেক আটকে থাকা প্রকল্প চালু করেছে। আশা করি এই স্মারকের কাজও শিগগিরই শুরু হবে।’ জেন্ডার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মিজানুর রহমানও একই আশা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মাহামুদুল হক সারাবাংলাকে বলেন, ‘বেরোবিতে স্বাধীনতা স্মারক মাঠে বিভিন্ন জাতীয় দিবসে অনুষ্ঠান হয়। ২০২৬ সালের স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসেও শিক্ষার্থীরা সেখানে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তবে পূর্ণাঙ্গ স্মারক না থাকায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সংরক্ষণ ও প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় শূন্যতা রয়ে গেছে। আমাদের শিক্ষার্থী ও সচেতন মহলের দাবি—দুর্নীতির অভিযোগ স্বচ্ছভাবে তদন্ত করে যত দ্রুত সম্ভব এই ঐতিহাসিক স্মারকের নির্মাণকাজ শেষ করা হোক।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই স্মারকটি শুধু একটি ভাস্কর্য নয়, এটি বেরোবির শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা ও দায়বদ্ধতার প্রতীক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।’