Monday 30 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

কক্সবাজারে হামের সংক্রমণ, হাসপাতালে ভর্তি ১০৮ শিশু

ডিস্ট্রিক্ট করেসপনডেন্ট
৩০ মার্চ ২০২৬ ২০:০০ | আপডেট: ৩০ মার্চ ২০২৬ ২১:০৩

হামের সংক্রমণে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে শিশু রোগী বাড়ছে। ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজার: জেলায় হামের (মিজেলস) সংক্রমণ বাড়তে থাকায় মার্চ মাসজুড়ে শিশুদের হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জেলা সদর হাসপাতালে গত ১ মার্চ থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ১০৮ জন শিশু ভর্তি হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের পরিসংখ্যান কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছলিম উল্লাহ জানান, রোববার হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৩৩ জন শিশু। সোমবার নতুন করে আরও ১২ জন ভর্তি হয়েছে। এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসে হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল মাত্র ৯ জন শিশু, যা মার্চে এসে কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

কক্সবাজারের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মহিউদ্দিন আলমগীর বলেন, ‘বছরে সাধারণত বসন্ত ও বর্ষা মৌসুমে হামের প্রকোপ বাড়ে। বর্তমান সংক্রমণ মৌসুমি দিক থেকে স্বাভাবিক হলেও এবার কিছুটা বেশি হওয়ায় আমরা সতর্ক অবস্থানে আছি।’

বিজ্ঞাপন

তিনি জানান, জেলায় এখন পর্যন্ত ৫৩টি সন্দেহভাজন কেস শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষার জন্য পাঠানো নমুনার মধ্যে ২৮টি পজিটিভ এসেছে। আক্রান্তদের মধ্যে রামুর মিঠাছড়ি এলাকা ও সদর উপজেলার পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পাহাড়তলী এলাকায় সংক্রমণ তুলনামূলক বেশি।

টিকাদান ঘাটতি ও অপুষ্টি ঝুঁকি বাড়াচ্ছে

স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, টিকাদান কর্মসূচির ফাঁকফোকর এবং শিশুদের পুষ্টিহীনতা সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

ডা. আলমগীর বলেন, ‘টিকাদানের আওতা সাধারণত ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত হলেও কিছু শিশু বাদ পড়ে যায়। আবার ভাইরাসের ধরন পরিবর্তনের কারণেও সংক্রমণ দেখা দিতে পারে।’

তিনি আরও জানান, ছিন্নমূল ও ঝরে পড়া শিশুদের মধ্যে টিকা না পাওয়া এবং অপুষ্টির কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি থাকে। এ পরিস্থিতিতে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল বিতরণসহ সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

অত্যন্ত সংক্রামক রোগ

কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাহজাহান নাজির বলেন, ‘হাম বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক রোগ। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে একটি এলাকায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত শিশু সংক্রমিত হতে পারে।’

তিনি জানান, সাধারণত ৫ বছরের নিচের শিশু, বিশেষ করে এক বছরের কম বয়সীরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে ৯ মাস বয়সের আগেই শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে। যা মাতৃদুগ্ধ থেকে প্রাপ্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

উখিয়ায় আক্রান্ত রোহিঙ্গা শিশুও

উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. এহেচান উল্লাহ সিকদার জানান, বর্তমানে সেখানে ২ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। তিনি বলেন, ‘গত এক মাসে ৭ থেকে ৮ জন রোহিঙ্গা শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে।’

অন্যদিকে মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ মাহফুজুল হক জানান, গত এক মাসে সেখানে প্রায় ২০টি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে এবং বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ৪ জন শিশু।

উপসর্গ ও জটিলতা

হামের সাধারণ উপসর্গের মধ্যে রয়েছে জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি। জটিলতা দেখা দিলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানে সংক্রমণ এমনকি মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, অনেক ক্ষেত্রে ফুসকুড়ি ওঠার আগেই আক্রান্ত ব্যক্তি অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে দেয়, যা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তোলে।

প্রতিরোধে করণীয়

সংক্রমণ ঠেকাতে স্বাস্থ্য বিভাগ আক্রান্ত শিশুদের আলাদা রাখা, হাঁচি-কাশির সময় মাস্ক ব্যবহার, নিয়মিত হাত ধোয়া এবং টিকাদান কর্মসূচি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ ক্যাম্পেইনও চালানো হচ্ছে।

ডা. শাহজাহান নাজির বলেন, ‘যেসব এলাকায় টিকার কাভারেজ ৮৫ শতাংশের নিচে থাকে, সেখানে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি। তাই দ্রুত টিকাদান জোরদার করা জরুরি।’

স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত জেলায় হামে আক্রান্ত হয়ে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। তবে জটিল রোগীদের জন্য আইসিইউসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে মাঠপর্যায়ে ‘উঠান বৈঠক’, বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতা কার্যক্রম এবং নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর