রংপুর: অঞ্চলে আলুকে বলা হয় ‘সাদা সোনা’। এখন সেই ‘সাদা সোনা’-ই কৃষকের জন্য আশীর্বাদের বদলে হয়ে উঠেছে অভিশাপ। উৎপাদন খরচের অর্ধেক দামে বিক্রি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং হিমাগারের তীব্র সংকটে পড়ে প্রায় ৮০ হাজার আলুচাষি আজ চরম আর্থিক দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছেন। মাঠভরা বাম্পার ফলন থাকলেও কৃষকের ঘরে নেই স্বস্তি, বরং বাড়ছে ঋণ ও হতাশা।
মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দের কৃষক আলমগীর হোসেনের কণ্ঠেই ধরা পড়ে এই সংকটের বাস্তব চিত্র। তিনি বলেন, ‘প্রতি কেজি উৎপাদনে খরচ ১২-১৫ টাকা, বিক্রি করছি ৫-৮ টাকায়। এই লোকসান কীভাবে সামলাব?’ তিনি জানান, গত বছর ৪৭ বিঘা জমিতে আলু চাষ করে লোকসান গুনেছিলেন এবার মাত্র ২০ বিঘায় নেমে এসেছেন। কিন্তু হঠাৎ বৃষ্টিতে খেত তলিয়ে গেছে, আলু পচে যাচ্ছে। বাজারে দাম নেই।

এ অঞ্চলের প্রায় ৮০ হাজার আলুচাষির জীবন আজ একই রকম কষ্টের গল্প। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা, অন্যদিকে প্রকৃতির বৈরী আচরণ আর হিমাগারের তীব্র সংকট—এই ত্রিমুখী চাপে পিষ্ট রংপুর অঞ্চলের আলুচাষিরা। গত বছরের লোকসানের কারণে এবার আবাদ কমেছে—১ লাখ ১৯ হাজার হেক্টর থেকে নেমে ১ লাখ ৫ হাজার হেক্টরে তবুও শেষ রক্ষা হয়নি তাদের। মাঠ ভরা বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের ঘরে এখন শুধু হাহাকার আর চরম দুর্দশা।

যুদ্ধের আগুনে পুড়ছে কৃষকের স্বপ্ন
আলুর রাজধানী হিসেবে পরিচিত রংপুরের মিঠাপুকুরসহ বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার মেট্রিক টন আলু মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নেপাল ও ভুটানে রফতানি হতো। কিন্তু ইরান ও আমেরিকার মধ্যকার যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সংকট ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ফলে বিদেশি ক্রেতারা আপাতত আলু কিনতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন।
সূত্র বলছে, গত বছর ১৯ হাজার মেট্রিক টনের বেশি আলু রপ্তানি হলেও এবার তা নেমে এসেছে তলানিতে। যুদ্ধের কারণে রপ্তানিকারকরা সাহস পাচ্ছেন না বড় বিনিয়োগের।
প্রকৃতি ও বাজারের নিষ্ঠুর পরিহাস
আলুচাষিরা জানান, এ বছর আলু আবাদে খরচ হয়েছে কেজিপ্রতি ১২ থেকে ২০ টাকা। অথচ বর্তমানে বাজারে সেই আলু বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ৫ থেকে ৮ টাকায়। এর ওপর মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে হঠাৎ অসময়ের ঝড়-বৃষ্টি। বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পচন আতঙ্কে রয়েছেন কৃষক। বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে অনেক খেত। পানি জমে আলুতে পচন ধরা শুরু করেছে। এছাড়া অভাবের তাড়নায় অনেক নারী ও পুরুষ শ্রমিক সারা দিন আলু তোলার বিনিময়ে মজুরি হিসেবে মাত্র ২০ কেজি আলু নিয়ে বাড়ি ফিরছেন।
হিমাগার সংকট: ৭০ শতাংশ আলুর ঠাঁই নেই
রংপুর এখন দেশের বৃহত্তম আলু উৎপাদনকারী অঞ্চল (দেশের মোট উৎপাদনের ১৫%)। কিন্তু ভয়াবহ তথ্য হলো, এ অঞ্চলে উৎপাদিত আলুর ৭০ থেকে ৭৮ শতাংশ রাখার মতো কোনো হিমাগার সুবিধা নেই। জেলায় ৪০টি হিমাগারে মোট ধারণক্ষমতা মাত্র ৪ লাখ ১৬ হাজার টন—যা উৎপাদনের খুবই কম। ক্ষুদ্র চাষিরা জায়গা পান না।
নগরের তালুক উপাসু গ্রামের কাজল মিয়া এক একর জমিতে আলু চাষ করেছেন। খরচ হয়েছে কেজিপ্রতি ২০ টাকা। বাজার দাম ১৩-১৪ টাকা। হিমাগারে জায়গা না পেয়ে বাধ্য হয়ে লোকসানে বিক্রি করছেন। তিনি বলেন, ‘জমি ইজারা, বীজ—সব মিলিয়ে যা খরচ, তাতে লাভের আশা ছিল। এখন উভয়সংকট।’
রংপুর কৃষি বিপণন অধিদফতর জানায়, অহিমায়িত মডেল ঘরসহ সব মিলিয়ে মাত্র ৩০ শতাংশ আলু সংরক্ষণ সম্ভব। বাকি আলু মৌসুমে কম দামে বিক্রি করতে হয়।
আলুচাষি সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেনের কথায়, ‘উৎপাদন বেশি হলে চাষি, কম হলে ভোক্তা—সবাই ক্ষতিগ্রস্ত। সরকারের নজরদারি নেই।’
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুসারে, রংপুরে আলুচাষি সংখ্যা ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫০০। গত পাঁচ বছরে রপ্তানি সবচেয়ে বেশি ছিল ২০২১-২২ সালে (১৯ হাজার টন), গত মৌসুমে মাত্র ৩৭৪ টন। এবার মার্চ-এপ্রিলে ৩৮৭ টন।
জেলা আলুচাষি ও ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ বণিক বলেন, “অতিরিক্ত আলু বিদেশে রপ্তানি আর প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে তুললে লোকসান কমানো যায়। প্রতি উপজেলায় হিমাগার আর আলুকেন্দ্রিক কারখানা দরকার।”
উত্তরণের পথ
কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের আলু রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। আলুচাষি সংগ্রাম কমিটির নেতারা এবং সাধারণ কৃষকরা তিনটি প্রধান দাবি তুলে ধরে বলছেন, উপজেলা ভিত্তিক সরকারি হিমাগার, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প ও সরাসরি সরকারি রপ্তানির ব্যবস্থা করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
আলুচাষি সংগ্রাম কমিটির জেলার আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘হিমাগার সংকট দূর করতে প্রতিটি উপজেলায় সরকারি অর্থায়নে কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণ করতে হবে। চিপস বা স্টার্চ তৈরির মতো আলুকেন্দ্রিক শিল্পকারখানা রংপুরে স্থাপন করা জরুরি। এছাড়া বেসরকারি রপ্তানিকারকদের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি সরকারি উদ্যোগে আন্তর্জাতিক বাজার ধরার বিকল্প নেই।’
কৃষি-অর্থনীতি গবেষক ও বিশ্লেষক রায়ান আহমেদ রাজু বলেন, ‘রংপুরের অর্থনীতি আলুর ওপর দাঁড়িয়ে। যদি এখনই এই বিশাল লোকসান ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে আগামীতে এ অঞ্চলের কৃষকরা আলু চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হবেন, যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। মাঠের ফসল যেন কৃষকের চোখের জল না হয়, এটাই এখন উত্তরের জনপদের একমাত্র আকুতি।’