চুয়াডাঙ্গা: ভূ-গর্ভস্থ পানিরস্তর সর্বোত্তম পর্যায়ে রাখা, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, বৃষ্টির পানি মজুত করে শুষ্ক মৌসুমে সেচের মাধ্যমে উচ্চ ফলনশীল শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও গৃহস্থলী কাজে পানি ব্যবহারে সংরক্ষাণাগার স্থাপন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল।
পাশাপাশি পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন করে বন্যার প্রভাব কমিয়ে আনা, ফসল ও স্থানীয় জনগণকে রক্ষা, মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রকল্প এলাকায় কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচন করে জীবনযাত্রার মান ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন পরিকল্পনায় ২০২২ সালে ভৈরব নদে শুরু হয় ১৪ ভেন্টবিশিষ্ট পানি সংরক্ষণাগার প্রকল্প।
তবে প্রকল্পের শুরু থেকেই অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা চলছে। স্বল্প জনবল দিয়ে কাজ করানো, নদের দু’পাশে অপরিকল্পিতিভাবে বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহ ঠেকিয়ে নির্মাণ কাজ চলছে প্রায় পাঁচ বছর ধরে। এতে অসুবিধার মধ্যে পড়েছে ভৈরব নদের আশপাশের গ্রামের বাসিন্দা ও কৃষকরা।
চুয়াডাঙ্গা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন ভৈরব নদ পুনঃখনন (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পের কাজ ২০২৩ সালের ১৫ জানুয়ারি উদ্বোধন করা হয়। ২০২১-২০২২ অর্থবছর থেকে ২০২২-২০২৩ এ কাজটি শেষ হওয়ার কথা ছিল। এ কাজের প্যাকেজ নম্বরটি বি এইচ-২/২০২১-২০২২/এসটি-৫ (দরপত্র প্রস্তাবের আইডি নম্বর ৬৬৯২৪৮)।
বোর্ড আরও জানায়, কাজের প্রাক্কলিত মূল্য ধরা হয়েছিল ৩১ কোটি ১৫ লাখ ৫৪ হাজার ২৬২ দশমিক ৪৬৫ টাকা। চুক্তি মূল্য ধরা হয় ২৮ কোটি ৩ লাখ ৯৮ হাজার ৮৩৬ দশমিক ২১৯ টাকা। কার্যাদেশ দেওয়া হয় ২০২২ সালের ২১ জুলাই। কিন্তু, কাজটি শুরু হয় ২০২২ সালের ২৭ জুলাই। প্রকল্পের কাজটি শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ সালের ২৯ জুন। রাজনৈতিক বিবেচনায় নদীর কাজে অনভিজ্ঞ ও কালো তালিকাভুক্ত ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান তমা কনট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড ও কুষ্টিয়ার ঠিকাদার নাসির উদ্দিন মোল্লা যৌথভাবে কাজটি পায়।
সুবলপুর ও তার আশপাশ গ্রামের কৃষকদের আভিযোগ, পানি সংরক্ষণাগার নির্মাণ কাজের শুরুতেই তৎকালীন সংসদ সদস্য আলী আজগার টগরের প্রত্যক্ষ প্ররোচণায় তার আপন ভাই সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলী মনছুর বাবু ও আরিফ হোসেন ভৈরব নদের মাটি কেটে কয়েক কোটি টাকায় ইটভাটায় বিক্রি করে দেয়। ফলে নদের পাশে কৃষকের ফসলী জমি এবং সুবলপুর গ্রামের একমাত্র চলাচলের রাস্তাটি ভাঙনের কবলে পড়েছে। এ ছাড়া জোরপূর্বক ভৈরব নদে বাঁধ দেওয়ার কারণে বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি উপচে সুবলপুর, পাটাচোরা, কাঞ্চনতলা, রঘুনাথপুর, ছুটিপুর ও কাজলার চর এলাকার কৃষকদের ফসলী জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।
কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে থাকার কারণে কৃষকদের ফসল ফলাতে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। জলাবদ্ধতা থেকে রেহাই পেতে এবং ডুবে যাওয়া জমির ফসল রক্ষায় কয়েকটি গ্রামের কৃষকরা একতাবদ্ধ হয়ে ২০২৩ সালের নভেম্বরে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ও ২০২৫ সালের জুলাই মাসে সুবলপুরের ভৈরব নদের ভেতর নির্মাণ কাজ করার জন্য বাঁধ দেওয়া হয়। কিন্তু সেই বাঁধ কেটে দিয়ে নদের পানিপ্রবাহ চালুর ব্যবস্থা করে দেয়। ফলে প্রকল্পের কাজে ব্যাঘাত ঘটে, পানিতে ডুবে যায় নির্মাণাধীন অবকাঠামো। পানি শুকিয়ে যাওয়ার পর গত ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে ফের স্বল্প জনবল নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। যদিও কাজের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত টেনে নেওয়া হয়েছে।
পাটাচোরা গ্রামের ভুক্তভোগী বাসিন্দারা জানান, নদীর তীরে কৃষকরা আবাদ করতেন। পানি সংরক্ষণাগার নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার পর নদের দু’ধারে মাটি কাটার কারণে ফসলি জমিতে ভাঙন সৃষ্টি হয়। এই গ্রামে গরিব মানুষের বসবাস। মাঠের একবিঘা ফসলি জমি ভেঙে যাওয়া, তাদের জন্য বড় ক্ষতি। ভৈরব খননে অনিয়মের কারণে ফসলি জমি বিনষ্ট হয়েছে। দামুড়হুদা উপজেলা শহরে যাওয়ার একমাত্র রাস্তাটি ভেঙে গেছে। পাটাচোরা গ্রামের চারিদিকে নদী। সেকারণে জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে দু’বছর শুধু মাটি বিক্রি করা হয়েছে। এখান থেকে কয়েক কোটি টাকার মাটি বিক্রি করেছে এমপির লোকজন। মাটি না কাটার জন্য বলা হলে, তারা বলে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি আছে। কাজে বাধা দিলে ধরে নিয়ে যাওয়া হবে। তারা অনেক মাটি কেটেছিল। ওই মাটি এমপির ভাটায় নিয়ে যাওয়া হয়।
চুয়াডাঙ্গা নদী বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক মুন্সী সারাবাংলাকে বলেন, ‘নদীর মাঝখানে রিজার্ভার তৈরির কথা। বাউন্ডারি দিয়ে যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে এই রিজার্ভার তৈরি করার কথা, তা কিন্তু হচ্ছে না। অনেক দিন অবৈধভাব নদের পানিপ্রবাহ বন্ধ করে যে নির্মাণ কাজ করা হচ্ছে, তাও ঠিক হচ্ছে না। পানি আটকে থাকার কারণে খনন করা নদের নিচে ফের পলি পড়ে তলদেশে পানি ধারণ ক্ষমতা কমে যাবে। ফলে আবারও রাষ্ট্রের টাকা গচ্চা দিয়ে এই নদ পুনঃখনন করতে হবে, যেটা কাম্য নয়। নদ-নদীর কাজে পারদর্শী এমন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান দিয়ে কাজ করালে এ সমস্যাটি হতো না।’
চুয়াডাঙ্গা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী নাজিম উদ্দিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘দামুড়হুদা উপজেলার সুবলপুর গ্রামে ভৈরব নদের ভেতর ২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪ ভেন্টবিশিষ্ট পানি সংরক্ষণাগারের নির্মাণ কাজ চলছে। কাজটি ২০২৫ সালের জুন মাসে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কাজটি সময় মতো করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রকল্পের কাজের মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। কাজটি দ্রুত সময়ের মধ্যেই শেষ হবে। কাজ করার সময় যেসব সমস্যা তৈরি হয়েছে, সেগুলো ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ঠিক করে দেবে।’
উল্লেখ, কিছুদিন আগে ভৈরব নদটি সংস্কার করা হয়েছে। এ কারণে নদটিতে প্রাণ ফিরে পেয়েছে, বেড়েছে পানিও। নির্মাণাধীন প্রকল্পের কাজ শেষে নদটির তলদেশে পলি পড়ে যেন আগের মতো অবস্থার সৃষ্টি না হয়, সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এলাকাবাসী।