ঢাকা: ভোরের নরম আলো তখনও রমনা পার্কের সবুজ ঘাসে আলসেমি কাটিয়ে ওঠেনি। কিন্তু এরই মাঝে পার্কের লেকের পাড় মুখর হয়ে উঠেছে এক রঙিন উৎসবে। আজ ১২ এপ্রিল, রোববার আদিবাসী সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান উৎসব ‘ফুলবিঝু’। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় সিএইচটি ওয়েলফেয়ার সোসাইটির উদ্যোগে আয়োজিত এই ‘ফুল গোজানী’ উৎসব যেন ঢাকা শহরের যান্ত্রিকতাকে কয়েক মুহূর্তের জন্য ভুলিয়ে দিয়ে এক টুকরো পাহাড়কে নিয়ে এসেছে সমতলে।
সকাল থেকেই উৎসবপ্রিয় মানুষরা জড়ো হতে থাকেন রমনা পার্কে। পাহাড়ি নারীদের পরনে উজ্জ্বল রঙের পিনন আর হাদি, মাথায় বাহারি ফুলের মালা। উৎসবের শুরুতেই লেকের পানিতে ফুল ভাসিয়ে প্রার্থনা করা হয়।
আদিবাসী বিশ্বাস অনুযায়ী, বয়ে চলা জলে ফুল ভাসানোর মাধ্যমে পুরনো বছরের দুঃখ, কষ্ট আর অমঙ্গলকে বিদায় জানানো হয় এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানানো হয় এক নির্মল চিত্তে। কল্পনা চাকমা নামে এক তরুণী বলেন, “আমাদের কাছে ফুলবিঝু মানেই নতুন করে বেঁচে ওঠার আনন্দ। সকালে যখন জলে ফুল ভাসিয়ে প্রার্থনা করছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল পুরনো সব গ্লানি ধুয়ে যাচ্ছে। ঢাকার এই যান্ত্রিক জীবনে রমনা পার্কের লেকটাই আজ আমাদের কাছে পাহাড়ি ঝরনা হয়ে ধরা দিয়েছে।”
আবার মেখলা তঞ্চঙ্গ্যা নামে একজন গৃহিণী বলেন, “আমি এসেছি আমার ছোট ছেলেকে নিয়ে। প্রবাসে বা শহরে থাকলেও আমরা যেন আমাদের শেকড় ভুলে না যাই, সেটাই বড় কথা। আজ যখন প্রার্থনায় হাত জোড় করলাম, তখন শুধু পরিবারের মঙ্গলের কথা নয়, বরং সকল মানুষের শান্তির জন্য আশীর্বাদ চেয়েছি।”

উৎসবের শুরুতেই লেকের পানিতে ফুল ভাসিয়ে প্রার্থনা করা হয়। ছবি: সারাবাংলা
নারীদের সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে জলে ফুল ভাসানোর দৃশ্যটি ছিল মনে রাখার মতো। তাদের হাত জোড় করা প্রার্থনা আর বিনম্র ভঙ্গি যেন প্রকৃতির সাথে মানুষের এক আত্মিক সম্পর্কের জানান দিচ্ছিল।
স্বপরিবারে আসা চন্দনা মারমা জানান, “পাহাড়ের সেই আদি ঐতিহ্য যখন এই ব্যস্ত ঢাকা শহরে দেখি, তখন বুকটা ভরে ওঠে। আমরা যখন জলে ফুল ভাসাই, তখন সেটা কেবল উৎসব থাকে না, হয়ে ওঠে প্রকৃতির প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম। আজকের আয়োজন দেখে মনে হচ্ছে আমরা সবাই এক সুতোয় গাঁথা।
তবে ভিড়ের মাঝে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণই ছিল এই আয়োজনের মূল প্রাণ। বর্ণাঢ্য র্যালিতে যখন আদিবাসী তরুণ-তরুণীরা সামিল হয়, তখন ব্যানার আর ফেস্টুনের ভিড়ে এক টুকরো বৈচিত্র্যময় বাংলাদেশ ফুটে ওঠে।

অনুষ্ঠানে আসা অতিথিদের জন্য ছিল পরিমিত জলখাবারের ব্যবস্থা, তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল পাহাড়ি নৃত্য। আদিবাসী নাচের সেই চিরাচরিত ছন্দ আর বাদ্যযন্ত্রের ধ্বনি পার্কের শান্ত পরিবেশে এক অন্যরকম মাদকতা তৈরি করে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান বলেন, ঢাকার বুকে এমন বর্ণাঢ্য আয়োজন দেখে আমি অভিভূত। আমাদের আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব পরিচয় ও সংস্কৃতি নিয়ে গর্বিত। এই যে লেকের জলে ফুল ভাসিয়ে পুরনোকে বিদায় জানানো এবং নতুনকে বরণ করে নেওয়া, এটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সরকারিভাবে আমরা সবসময় এই ধরনের সাংস্কৃতিক বিকাশে সহযোগিতা করে আসছি এবং ভবিষ্যতেও আমাদের এই সমর্থন অব্যাহত থাকবে। সম্প্রীতির এই বন্ধনই আমাদের মূল শক্তি।”
এই উৎসব কেবল একটি ধর্মীয় বা গোষ্ঠীগত আচার নয়, বরং এটি আমাদের সাংস্কৃতিক বিকাশের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। পাহাড়ের বৈচিত্র্য যখন সমতলে এসে মিশে যায়, তখন তা হয়ে ওঠে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের এক জীবন্ত রূপ।
রমনা লেকের জলে ভেসে যাওয়া প্রতিটি ফুল যেন আগামী দিনের উজ্জ্বল সম্ভাবনা আর শান্তির বার্তা নিয়ে দূর বহু দূরে বয়ে যাচ্ছিল। ঢাকা শহরের ব্যস্ত নাগরিকরা থমকে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন সেই দৃশ্য, যেখানে প্রকৃতি আর মানুষ মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল বিঝুর আনন্দ ধারায়। এই সুন্দর উদ্যোগটি প্রমাণ করে দিয়েছে, আমরা যেখানেই থাকি না কেন, শেকড়ের টান আমাদের সবসময় এক জায়গায় নিয়ে আসে। দিনব্যাপী এই আয়োজনে হাসি, গল্প আর আনন্দ ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে এক অবিস্মরণীয় ফুলবিঝু উৎসবের।