Thursday 12 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

চট্টগ্রামে সকাল থেকেই ভোটকেন্দ্রে নবীন-প্রবীণ ভোটারেরা, চোখেমুখে উচ্ছ্বাস

স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:১০ | আপডেট: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:১৬

নগরী ও জেলায় বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে সকাল থেকেই ভোটারের সারি দেখা গেছে। ছবি: সারাবাংলা

চট্টগ্রাম ব্যুরো: স্বতঃস্ফূর্তভাবে চট্টগ্রামে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিচ্ছেন নারী-পুরুষ, তরুণ-যুবকসহ বিভিন্ন বয়সের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার আপামর ভোটারেরা। চট্টগ্রাম নগরী ও জেলায় বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে সকাল থেকেই ভোটারের সারি দেখা গেছে। গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতির হার তুলনামূলক বেশি দেখা গেছে।

অশীতিপর বৃদ্ধ থেকে জীবনে প্রথমবার ভোট দেওয়া সদ্য কৈশোর পার করা তরুণ- সবার চোখেমুখে অন্যরকম উচ্ছ্বাস। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনটি বিতর্কিত সংসদ নির্বাচনে ভোট নিয়ে নেতিবাচক অভিজ্ঞতার পর পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ভোট দেওয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে বেশ উৎসাহ দেখা গেছে।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ। একটানা চলবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত। এরপর গণনা শেষে ফলাফল ঘোষণা করা হবে। চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে মহানগরীর দুইটি এবং তিন উপজেলার সঙ্গে নগরীর একাংশ মিলে গঠিত তিনটিসহ মোট পাঁচটি আসনে রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ জিয়াউদ্দীন। এসব আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হবে জেলা স্টেডিয়ামে স্থাপিত নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে।

ভোট দিচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম (বীর প্রতীক)। ছবি: সারাবাংলা

মহানগরীর একটি আসনের রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন চৌধুরী। চট্টগ্রাম বন্দর স্টেডিয়ামে স্থাপিত নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে এ আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হবে। বাকি ১০টি আসনের অবস্থায় জেলার মধ্যে। এসব আসনে রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। এসব আসনের ফলাফল ঘোষণা হবে জেলা প্রশাসনে স্থাপিত নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে।

সকাল সাড়ে ৭টায় নগরীর চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালী-বাকলিয়া) আসনের আন্দরকিল্লা ওয়ার্ডে কদমমোবারক এম ওয়াই উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, ভোটগ্রহণ শুরুর আগ থেকেই কেন্দ্রের মূল ফটকে পুরুষ ভোটারদের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। নারী ভোটারদের কেউ কেউ বাইরে ঘুরছেন। কেন্দ্রের বাইরে এ আসনের প্রার্থী বিএনপির ধানের শীষের আবু সুফিয়ান ও জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লার একেএম ফজলুল হকের অস্থায়ী কার্যালয় দেখা গেছে।

সকাল ৮টার দিকে জামালখান ওয়ার্ডে ডা. খাস্তগীর সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে অবশ্য ভোটারের তেমন ভিড় দেখা যায়নি। সেই কেন্দ্রে গিয়ে দেখা মিলল সত্তরোর্ধ বৃদ্ধ নুরুল আবছার ও ষাটোর্দ্ধ আরিফ সোবহানের সঙ্গে। উভয়েই জামালখান এলাকার বাসিন্দা।

নুরুল আবছার সারাবাংলাকে বলেন, ‘২০১৮ সালে ভোট দিয়েছিলাম। তখন একটা সিস্টেম ছিল, সকাল থেকে লোকজন লাইন ধরে দাঁড়িয়ে থাকতো। এগুলোর বেশিরভাগই এখানকার ভোটার ছিলেন না, বহিরাগত। কেন্দ্রে ভোটার বেশি এটা দেখানোর জন্য তারা দাঁড়িয়ে থাকতো। আমরা দাঁড়িয়ে থাকতাম, লাইন আর আগাতো না। এবার আর আগের পরিবেশ নেই। খুব সুন্দরভাবে ভোট দিলাম।’

আরিফ সোবহান সারাবাংলাকে বলেন, ‘২০২১ সালে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলাম। তখন একটা টেলিভিশনের রিপোর্টার আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ভোট কেমন হচ্ছে ? চারপাশে আওয়ামী লীগের লোকজন ঘোরাফেরা করছিল। আমি বলালম- ভোট সুষ্ঠু হচ্ছে। সেটা সারাদিন টেলিভিশনে বারবার দেখাল। আমি খুব লজ্জা পেয়েছিলাম। এরপর ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি যে নির্বাচনটা হয়েছিল, সেবার আর ভোট দিতে আসিনি। অবশ্য সেই নির্বাচনে ভোট দেওয়া না দেওয়া একই কথা ছিল। এবার ভালোভাবে ভোটটা হচ্ছে, আমরা সবাই আনন্দিত।’

ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে নারী-পুরুষ মিলিয়ে ৪ হাজার ৮৬ ভোটার আছেন। এ আসনে ১০ জন প্রার্থী থাকলেও ৮টি ভোটকক্ষে সব প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট ছিল না। শুধু বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামিক ফ্রন্টের প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট আছে বলে জানান প্রিসাইডিং অফিসার মুহিবউল্লাহ।

ভোট কেন্দ্রের বাইরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন ভোটাররা। ছবি: সারাবাংলা

ওই কেন্দ্রে ভোট দেন চট্টগ্রাম-৯ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. একেএম ফজলুল হক। ভোট দিয়ে বেরিয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘সুষ্ঠু, সুন্দর, নিরপেক্ষ পরিবেশে ভোটগ্রহণ হচ্ছে। ভোটাররা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিচ্ছেন। জয়ের ব্যাপারে আমরা আশাবাদী। আশা করি, সম্মানিত ভোটারেরা একটি ন্যায় ও ইনসাফের বাংলাদেশের পক্ষে এবং ফ্যাসিবাদি কাঠামোর বিরুদ্ধে তাদের মূল্যবান রায় প্রদান করবেন।’

নগরীর আন্দরকিল্লা ওয়ার্ডের মুসলিম এডুকেশন সোসাইটি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে মোট ভোটার ৫ হাজার ১৯৬ জন। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কেন্দ্রটি প্রায় ভোটারশূন্য দেখা গেছে। কেন্দ্রে নারী-পুরুষ মিলিয়ে মোট ৯টি বুথ। সব বুথে শুধুমাত্র ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার এজেন্ট দেখা গেছে।

প্রিজাইডিং অফিসার হাসান মোহাং মিনহাজুর রহমান সারাবাংলাকে জানিয়েছেন, আর কোনো এজেন্ট কেন্দ্রে আসেননি। সকাল ১০টা পর্যন্ত ওই কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন ৩২৮ জন। ভোটের হার ৫ শতাংশের মতো।

ওই কেন্দ্রে ভোট দিয়ে বেরিয়ে নগরীর হাজারী লেইনের বাসিন্দা রতন আচার্য্য সারাবাংলাকে বলেন, ‘ভোট নির্বিঘ্নে দেওয়া যাচ্ছে। কোনো সমস্যা হচ্ছে না। এখানে মহিলা ভোটার বেশি। মহিলারা সাধারণত দুপুরের দিকে ভোট দিতে আসেন।’

চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড উপজেলা ও নগরীর একাংশ) আসনের উত্তর কাট্টলীর হাজী দাউদ প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাট্টলী নুরুল হক প্রাথমিক বিদ্যালয়, জয়তারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর কাট্টলী সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটারের বেশি ভিড় দেখা গেছে। ভোটাররা সুশৃঙ্খলভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দিচ্ছেন।

উত্তর কাট্টলী এলাকার বাসিন্দা যুবদল নেতা সাহেদ আকবর সারাবাংলাকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের অ্যাপসে ভোটার নম্বর খুঁজে পাচ্ছেন না অনেকে। তালিকা ধরে খুঁজে নিতে হচ্ছে। এটা নিয়ে অনেক ভোটার বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ছেন।’

চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী ও নগরীর একাংশ) আসনের দক্ষিণ সারোয়াতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রেও সকাল থেকেই ভোটারের লম্বা লাইন দেখা গেছে। নবীন-প্রবীণ ভোটারেরা সুশঙ্খলভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন।

ওই কেন্দ্রে ভোট দিয়ে বেরিয়ে বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইসমাইল সারাবাংলাকে বলেন, ‘১৭ বছর পর ভোট দিতে এলাম। গত ১৭ বছরে আসলে কোনো নির্বাচনে ভোট দেওয়ার মতো পরিবেশ ছিল না। এবার সুন্দরভাবে সবাই নিজের ভোটটা দিতে পারছেন। কোনো গুণ্ডা-মাস্তানের হুমকি, ভয়ভীতি নেই। এটাই পরিবর্তিত বাংলাদেশ।’

এদিকে মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা। বৃহস্পতিবার সকালে বাঁশখালী উপজেলার সাধনপুর ইউনিয়নের বাণীগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।

রিটার্নিং কর্মকর্তা জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘জাতির অনেক দিনে প্রত্যাশা এ ভোটে ভোটারদের ঢল নেমেছে। মানুষ তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিচ্ছেন। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে’ ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, “সমগ্র চট্টগ্রামের সব কেন্দ্রে সঠিক সময়ে ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে।’

কেন্দ্রের নিরাপত্তার বিষয়ে জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘মানুষের স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণ দুষ্কৃতকারীদের ঠেকিয়ে দেবে।’

সকাল ১০টার দিকে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ নাজির আহমদ খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আনোয়ারা উপজেলা হয়ে আমরা বাঁশখালী আসলাম। কোথাও কোন অপ্রীতিকর পরিস্থিতির খবর শুনিনি। আমাদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা আছে। আশাকরি মানুষ উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দেবেন।’

সারাবাংলা/আরডি/ইআ
বিজ্ঞাপন

আরো