Tuesday 13 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

জেলা পুলিশের তথ্য
চট্টগ্রামে হিন্দু-বৌদ্ধদের ঘরে অগ্নিসংযোগে জড়িত ‘আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ’

স্পেশাল‌ করেসপন্ডেন্ট
১৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১৯:২৮

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আহসান হাবিব পলাশ। ছবি: সারাবাংলা

চট্টগ্রাম ব্যুরো: সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের রাউজানে হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বসতঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনায় নিষিদ্ধ ‘আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের’ নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততা পেয়েছে পুলিশ। কোনো সংগঠনের নাম উল্লেখ না করে পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে হিন্দু-বৌদ্ধরা নিরাপদে নেই বলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রচারণা চালাতে এবং বিদেশে পলাতক নেতানেত্রীদের দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরিতে পরিকল্পিতভাবে এ নাশকতা করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) দুপুরে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের নাসিরাবাদের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব বিষয় তুলে ধরেন পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আহসান হাবিব পলাশ। অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এ পর্যন্ত গ্রেফতার সাতজনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য জানাতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

বিজ্ঞাপন

গ্রেফতার হওয়া সাতজন হলেন- মনির হোসেন, মোহাম্মদ ওমর ফারুক, মোহাম্মদ কবির হোসেন, কার্তিক দে, বিপ্লব বড়ুয়া, মোহাম্মদ লোকমান ও মোহাম্মদ পারভেজ।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে, গত ২ জানুয়ারি রাঙামাটি জেলা সদরের কলেজ গেট এলাকা থেকে মনিরকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তিনি ইতোমধ্যে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে দায় স্বীকার করেছে। তার দেওয়া তথ্যে বাকি ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়।

তাদের কাছ থেকে চারটি উসকানিমূলক ব্যানার, কেরোসিন তেলের দুটি ছোট কনটেইনার, কেরোসিন তেলের একটি বোতল, তিনটি খালি প্লাস্টিকের বস্তা, একটি মোবাইল ফোন, একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে।

গত ১৯ ডিসেম্বর থেকে ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাউজান পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ৫টি ও বৌদ্ধদের একটি বসতঘরে আগুন দেওয়া হয়। প্রতিটি ঘটনাই ঘটেছে ভোরবেলায়। বসতঘরের বাইরে থেকে দরজা আটকে দেওয়া হয় আগুন। তবে এসব ঘটনায় কেউ হতাহত না হলেও বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপকভাবে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আগুনে পুড়ে যাওয়া বাড়ির কাছ থেকে পুলিশ হাতে লেখা বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনের ব্যক্তিদের নাম ও মোবাইল নম্বর লেখা ব্যানার জব্দ করে।

জেলা পুলিশের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধারাবাহিক আগুন দেওয়ার পুরো ঘটনায় কাজ করেছে ১২ থেকে ১৬ জনের একটি দল, যারা নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী। সারাদেশে একের পর এক নাশকতা তৈরির পরিকল্পনা ছিল চক্রটির, যা শুরু হয় রাউজান-রাঙ্গুনিয়া থেকে। পরিকল্পনা ছিল স্কুল-কলেজসহ আরও বড় বড় স্থাপনায় নাশকতা করা। উদ্দেশ্য ছিল নির্বাচনের আগে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নাজুক পরিস্থিতি তুলে ধরা।

পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, এ নাশকতার পেছনে অর্থায়ন করেছেন আওয়ামী লীগের নেতারা। তাদের কেউ দেশে এবং কেউ বিদেশে অবস্থান করছে। পুরো ঘটনায় খরচ করা হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ টাকার মতো।

সংবাদ সম্মেলনে ডিআইজি আহসান হাবিব পলাশ বলেন, ‘ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা ব্যানারে উল্লিখিত মোবাইল নম্বর ও হাতের লেখা যিনি লিখেছেন তাকে প্রথমে গ্রেফতার করা হয়। সিএনজি অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল যেগুলো পাঁচটি ঘটনাস্থলেই ব্যবহৃত হয়েছিল, সেগুলো উদ্ধার করা হয়েছে।’

আগুন দেওয়ার উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘উদ্দেশ্য ছিল- বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নেই এটা প্রমাণ করা। বাংলাদেশে হিন্দু, বৌদ্ধ এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠী নিরাপদ নেই- এটাকে আন্তর্জাতিকীকরণ করা। এই কার্যক্রমগুলো করার মাধ্যমে যদি বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তাহলে তাদের অনেক নেতানেত্রী দেশে ফিরে আসার সুযোগ পাবে। যারা মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থলগ্নিকারী ও বাস্তবায়নকারী তাদের সবারই তথ্য আমরা পেয়েছি। তাদের সবাইকে আমরা গ্রেফতার করতে পারিনি। তদন্তের স্বার্থে তাদের নামগুলো আমরা এ মুহূর্তে প্রকাশ করতে পারছি না।’

গ্রেফতার হওয়া কয়েকজন ‘নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের’ সদস্য বলে উল্লেখ করলেও নাম প্রকাশ করেননি ডিআইজি। প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আপনারা নিজেরাও জানেন নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন কারা রয়েছে। তাদের সদস্যরা রয়েছেন। এই ঘটনায় যে সম্পৃক্ত ব্যক্তি রয়েছেন তিনি ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে সমস্ত ঘটনা বিবৃত হয়েছে। তার আলোকে আমাদের এই বক্তব্য। এদের মধ্যে ২-৩ জন এবং পরিকল্পনাকারী ও অর্থ লগ্নিকারী সেই সংগঠনের সদস্য। তাদের ধরতে পারলে বাকি কাজটুকু সহজ হবে।’

‘যদি আমরা গ্রেফতার করতে না পারতাম, তাহলে তারা এ রকম একটা কাজ করত। মিডিয়া ফোকাস পাওয়ার জন্য মেইনলি। এই জনগোষ্ঠী নিরাপদ নয় আন্তর্জাতিকভাবে এটা প্রমাণ করার জন্য। এই জনগোষ্ঠী যদি বিব্রতকর অবস্থায় থাকে তাহলে বলার সুযোগ পাওয়া যাবে যে তাদের তো ভোটকেন্দ্রে যাবার সুযোগ নাই।’

গ্রেফতার হওয়াদের বিষয়ে ডিআইজি বলেন, ‘এই গ্রুপের মধ্যে হিন্দু মুসলমান বৌদ্ধ সবাই আছে। মূল কাজটাই হচ্ছে হিন্দু বৌদ্ধ ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা। তারা যেন এটা দেখে রাস্তায় নেমে আসে। হইহুল্লোড় করলে সরকার বিব্রত হয়, এটাই। তবে এটা বাংলাদেশের মানুষের চিন্তার প্রতিফলন কিন্তু না। যে বাংলাদেশের মুসলমান মানুষ হিন্দুর ওপর আক্রমণ করছে বিষয়টা তা মোটেও নয়। এই ১৬-১৭ জন লোকের একটা প্যাকেজ। তারা এই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অথচ আমাদের সবাইকে ব্লেইম নিতে হচ্ছে যে আমার বোধহয় হিন্দু গোষ্ঠীর ওপর চড়াও হচ্ছি। বাস্তবতা কিন্তু সেটা নয়।’

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর