Tuesday 27 Jan 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ঢামেক পরিক্রমা
ভর্তি ফি ২৫ টাকা হলেও গুনতে হয় ১৫০০ টাকা!

সোহেল রানা স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
২৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:০০

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ফাইল ছবি

ঢাকা: নাজমুল, বয়স ২৭ বছর। তিনি গত মাসে শ্বাসকষ্ট ও কিডনি সমস্যা নিয়ে সাভার থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আসেন। এর পর জরুরি বিভাগের টিকিট কাউন্টার থেকে ১০টাকা দিয়ে একটি টিকিট নেন। তার পর একটি ট্রলিতে করে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় জরুরি বিভাগের ১ নম্বর কক্ষে মেডিকেল অফিসারের কাছে। মেডিকেল অফিসার দেখে লিখে দেয়, নতুন ভবনের সাত তলায় নিতে হবে। ট্রলিম্যান ট্রলিতে করে সাত তলায় ৭০২ নম্বর ওয়ার্ডে নিয়ে যায়।

নাজমুলের এক স্বজন বলেন, ‘সাততলা থেকে চিকিৎসক আমার রোগীকে ভর্তি দেন। আবারও নিচে জরুরি বিভাগ থেকে ভর্তির ফরম নেওয়া হয়। সেখানে ভর্তির জন্য ১৫ টাকা লেখা থাকলেও ২০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। ভর্তির কাগজ নিয়ে উপরে উঠে দেখি আমার রোগীকে অবজারভেশন বেডে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। এবং ট্রলিম্যান তাদের কাছ থেকে ৫০০টাকা নিয়ে গেছে। ভর্তির পর বেড খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু বেড ফাঁকা থাকলেও ওয়ার্ড বয় ও আয়ারা দখল করে রেখেছে। পরে এক ওয়ার্ডবয়কে ৭০০ টাকা দিয়ে একটি বেড ম্যানেজ করি।’ তিনি আরও বলেন, ‘নামে মাত্র ২৫ টাকা খরচ। মূলত, ঢামেকে ভর্তি হতে গেলে ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা গুনতে হয়। এরপর প্রস্রাবের লাইনে নল লাগাইতে আয়াকে দিতে হয় ৩০০ টাকা। ২০০ টাকা দিতে গেলে ফেলে দেয়।’

বিজ্ঞাপন

কথা হচ্ছিল মহিউদ্দিন নামে এক রোগীর স্বজনের সঙ্গে। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘সরকারি হাসপাতাল গরিবদের জন্য। কিন্তু এখানে এসে মনে হচ্ছে, বেসরকারি হাসপাতালের চেয়েও বেশি খরচ। যদিও ভর্তির জন্য ২৫ টাকা লাগে। এর পর এখাতে-ওখাতে প্রায় ১৫০০টাকা গুনতে হয়। আবার লিফটের সামনে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। এই অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।’

তিনি বলতে থাকেন, ‘আমরা মনে করেছিলাম, ‘২৪ সালে দুর্নীতিবাজ সরকার পরিবর্তনের পর হাসপাতালের চিত্র কিছুটা হলেও পালটাবে। কিন্তু পালটানো তো দূরের কথা, পদে পদে প্রতারিত হতে হচ্ছে। হাসপাতালে ভিতরে একমিনিটের জন্যেও টেনশন ছাড়া থাকা যায় না। আনসাররা ডিউটি করলেও দালাল, মোবাইল চোর সবসময় বেডের পাশ দিয়ে ঘুরে বেড়ায়।’

কিশোরগঞ্জ থেকে আসা নাজমা বেগম নামে এক রোগীর স্বজন সারাবাংলাকে বলেন, ‘মাকে নিয়ে গত ডিসেম্বরে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি আসি। ভর্তি থেকে শুরু করে বেডে ওঠা পর্যন্ত খরচ হয়েছে ১৮০০টাকা। এরপর এই টেস্ট, সেই টেস্টতো লেগেই আছে। তারপরও সর্বক্ষণ টেনশনে থাকতে হয়। প্রতিটি ওয়ার্ডে আনসার সদস্যরা ডিউটি করেন। তবুও এর মধ্যে চোর ঢুকে রোগীর স্বজনদের মোবাইলসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় জিনিস চুরি করে নিয়ে যায়।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ওয়ার্ড বয় সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আসলে হাসপাতালের স্টাফরা টাকা ছাড়া কোনো কাজ করতে চায় না। সরকার কেন, পৃথিবী উলটে গেলেও হাসপাতালের এই চিত্র কোনোদিন ঠিক হবে না। আমার ওপরের চেয়ারে যারা বসেন তারা এটা ওটা আনতে বলে, চা-সিগারেট খেতে চায়। এসব টাকা কোথায় পাব। তখন বাধ্য হয়ে রোগীর কাছ থেকে বেড বাবদ, অথবা এ কাজ ও সে কাজ করে টাকা নিয়ে থাকি। ওয়ার্ড থেকে ট্রলিতে একটি পরীক্ষা করতে গেলেও ২০০ থেকে ৩০০টাকা নেয়। যেটা একদমই নিয়মের বাইরে।’

নতুন ভবনের ওয়ার্ড মাস্টার মো. রিয়াজ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নাই। করোনা ভাইরাসের সময় থেকে শুরু করে, আওয়ামী সরকারের সময়কালে তার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ জমা হয়। ‘২৪-এর জুলাইয়ের পর শিক্ষার্থীরা তার কক্ষ থেকে মদের খালি বোতলসহ অনেক কিছু উদ্ধার করে। এমনকি ছাত্রলীগের বড় বড় নেতাদের মোবাবইল নম্বরসহ একটি নোট বইও পাওয়া গিয়েছিল। এ ছাড়া, তিনি ছাত্রলীগের সহায়তায় বাইরের বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে রোগী ভাগানোর কাজও করতেন। এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের কাছে স্বীকারও করেন। এর পর ২০২৫ সালে তৃতীয় শ্রেণি কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি পদে নির্বচন করে পরাজিত হন। এই নির্বাচনে তিনি অনেক টাকা খরচ করেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

হাসপাতালের নতুন ভবনের কয়েকটি ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, অনেক নারী-পুরুষ স্পেশাল ডিউটি করেন। অভিযোগ রয়েছে, এদের অনেকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার করে টাকা নিয়ে কাজ করতে দিয়েছে ওয়ার্ড মাস্টার রিয়াজ। আর এরাই রোগীদের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেয়। আর এই টাকা নেওয়ার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ৭০২ নম্বর ওয়ার্ডের মনির, ৮০১ নম্বর ওয়ার্ডের রুমা, কবির, ৬০২ নম্বর ওয়ার্ডের জমির আলী ও ৮০২ নম্বর ওয়ার্ডের কামাল ও খালেদা।

হাসপাতালে কর্মরত গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা বলেন, ঢাকা মেডিকেলে চিকিৎসক ও নার্স বদলির নিয়ম থাকলেও তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের কোন বদলি হয় না। একজন কর্মচারী ২০ বছর পর্যন্ত একই জায়গায় রয়ে গেছে। এই সুযোগে তাদের আত্মীয়-স্বজনদের কাজে লাগিয়ে দিচ্ছে। আর এরাই অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছে।

এসব বিষয় জানতে কথা হয় ওয়ার্ড মাস্টার রিয়াজের সঙ্গে। সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে রিয়াজ বলেন, ‘বেডের জন্য রোগীর কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয় সত্য। তবে আমার কাছে এই টাকা আসে না। এমনকি কোনো স্পেশাল কর্মচারীর কাছ থেকে কোনো ধরনের টাকা -পয়সা নিইনি। যারা এসব বলে বেড়ায়, তাড়াই এসব কাজে জড়িত। ‘২৫ সালে শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে স্বীকার করেছিলাম। তবে ওসব কাজে আমি জড়িত ছিলাম না।’

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান সারাবাংলাকে বলেন, ‘প্রতিদিন সারা দেশ থেকে ঢাকা মেডিকেলে প্রায় হাজার খানেক রোগী আসে। অনেক সময় তারা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। কারণ, রোগীর তুলনায় জনবল কম। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কিছু অসৎ কর্মচারী অবৈধভাবে ইনকাম করছে। এর আগে কয়েকবার অভিযান চালিয়ে কয়েকজন বহিরাগতকে ধরে পুলিশে দেওয়া হয়েছে। অভিযান অব্যাহত রয়েছে। রোগীর সঙ্গে প্রতারণা করা অনেকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।’

পরিচালক বলেন, ‘বেড বাণিজ্য থেকে শুরু করে অনেক অনিয়মের অভিযোগ আমাদের কাছে আসে। আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থাও নিয়ে থাকি। রোগীদের স্বার্থে আমরা হাসপাতালের মাইকে সার্বক্ষণিক অ্যানাউন্স করে দিই, রশিদ ছাড়া কাউকে টাকা দিবেন না। সাধারণ বেডের জন্য কোনো টাকা নেওয়া হয় না। তবুও অনেক রোগীর স্বজন টাকা দিয়ে বেডে ওঠে।’

বিজ্ঞাপন

আরো

সোহেল রানা - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর