Thursday 05 Feb 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

উত্তরায় শিশু নির্যাতন
পুলিশের ক্লু-লেস তথ্যে ধোঁয়াশা কাটছেই না!

মেহেদী হাসান স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ২২:৪৯ | আপডেট: ৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০০:১৪

বাংলাদেশ বিমানের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ড. সাফিকুর রহমান। ছবি কোলাজ: সারাবাংলা

ঢাকা: রাজধানীর উত্তরায় শিশু গৃহকর্মী মোহনাকে নির্যাতনের ঘটনায় দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তুমুল প্রতিবাদ ও সমালোচনা। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন বাংলাদেশ বিমানের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ড. সাফিকুর রহমান (৬৬)। গ্রেফতারের পর পরই চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয় তাকে। নির্যাতনের ঘটনায় কারাগারে আরও আছেন তার স্ত্রী বিথী (৩৭), তাদের বাসারই দুই গৃহকর্মী রুপালি (৩৫) ও সুফিয়া (৫৫) এবং রুপালির দুই বছর ও ছয় মাস বয়সী দু’টি শিশুসন্তান।

জানা গেছে, বিমানের এমডির বাসায় কাউকে (শিশু) দেখাশোনার জন্য গতবছরের জুনে মোহনাকে গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ দেয়। তবে কাকে দেখাশোনা করতেন- তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। কারণ, মামলার এজাহারের তথ্যানুযায়ী, পুলিশের বক্তব্যের সঙ্গে কোনো মিল পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে, নির্যাতনের শিকার শিশু ও তার বাবার তথ্যের সঙ্গেও বিমানের এমডির পরিবারের তথ্য মিলছে না।

বিজ্ঞাপন

মামলার এজাহারে দেখা যায়, বিমানের এমডি সাফিকুরের বয়স ৬৬ বছর। তার স্ত্রীর বয়স ৩৭ বছর। এমডির বাসায় কাজ করা দুই গৃহকর্মী রুপালির বয়স ৩৫ বছর ও সুফিয়ার ৫৫ বছর। এ ছাড়া, দুই বছর ও ছয় মাস বয়সী দুই শিশু সন্তানের কেউ না থাকায় মা রুপালির সঙ্গে কারাগারে পাঠানোর সুপারিশ করে পুলিশ। একইসঙ্গে বিমানের এমডি ও তার স্ত্রীকেও কারাগারে পাঠানো হয়।

অভিযোগ উঠেছে, গৃহকর্মী মোহনা তাহলে কি রুপালির দুই শিশুকে দেখাশোনার জন্য বাসায় ছিলেন। এসব বিষয়ে পুলিশ ও পারিবারিক তথ্যের কোনো ক্লু মেলেনি। একদিকে পুলিশ অসংলগ্ন কথা বলছে, অন্যদিকে বিমানের এমডির পরিবার তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করছে না। বাসার যে দারোয়ান রয়েছেন তিনিও সঠিকভাবে কিছু বলতে পারছে না। ফলে পুরো বিষয়টি যেন ভুতুরে অবস্থা তৈরি করেছে।

নির্যাতনের ঘটনার প্রসঙ্গে ভুক্তভোগী শিশুর পিতা গোলাম মোস্তফা সারাবাংলাকে বলেন, ‘গতবছরের জুনে দারোয়ানের মাধ্যমে খবর পেয়ে সাফিকুর রহমানের উত্তরার বাসায় আমার মেয়ে মোহনাকে কাজে দিয়ে এসেছিলাম। বিথী হলেন সাফিকুরের দ্বিতীয় স্ত্রী। তার বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধুলা করার জন্য আমার মেয়েকে নিয়েছিল। আমাকে বলেছিল, ঘরের কোনো কাজ করতে হবে না। বাচ্চাদের সঙ্গে খেলবে ও সময় কাটালেই হবে। কিন্ত পরে জানতে পারি, আমার মেয়ে সারাদিন কাজ করতো, একটু বসে থাকলেই তাকে মারধর করতো। পাশাপাশি অন্য কাজের লোকেরাও মারধর করত।’

অমানবিক নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে ভুক্তভোগী শিশু জানায়, সামান্য ভুলেই তাকে বাথরুমে আটকে রাখা হতো। ঠিক মতো খাবার দেওয়া হতো না। বাচ্চার সঙ্গে বসে থাকতে দেখলেই মারধর করতো। এমনকি রাগ থামাতে খুন্তি আগুনে গরম করে তাকে ছ্যাঁকা দিতেন বিথী। অনেক সময় বিমানের এমডি সাফিকুর রহমানকে মারধরের বিষয়ে জানতে দেওয়া হতো না। আবার নির্যাতনের ঘটনা অন্য সময় জানলেও কিছুই বলতেন না। অবর্ণনীয় নির্যাতন তিনিও লুকাতেন। কারণ, মোহনার বাবা কয়েকবার বাসায় দেখতে এলেও তিনি সাক্ষাৎ করতে দেননি।

সাফিকুরের বাসার সিকিউরিটি গার্ড রফিক সারাবাংলাকে বলেন, ‘শিশুটি এই বাসায় যখন এসেছিল তখন তার শরীরে কোনো দাগ চোখে পড়েনি। আর যেদিন তাকে এই বাসা থেকে বিদায় দেওয়া হয় সেদিন তার শরীরে দাগগুলো চোখে পড়ে। তবে তারা নির্যাতন করেছিল কি না সেটি আমি জানি না। বিথী ম্যাডাম এবং স্যার আমাদের সঙ্গে কখনো কোনো খারাপ ব্যবহার করেননি।’

এদিকে গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনায় মূলত স্ত্রীর কর্মকাণ্ডে ড. সাফিকুর রহমান ফেঁসে গেছেন বলে দাবি প্রতিবেশিদের। বিল্ডিংয়ের বাসিন্দারা এবং আশপাশের লোকজনের মতে, সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেন সাফিকুর রহমান। তাদের দাবি, সাফিকুরের স্ত্রী হয়তো এই কাজ করে থাকতে পারেন। কিন্তু সাফিকুর রহমান পুরোটাই ভদ্রলোক। তিনি এমনটা করতেই পারেন না।

উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সজল আহমেদ রুবেল সারাবাংলাকে বলেন, ‘আসামি বিথীর বাচ্চাকে দেখাশোনার জন্য ভুক্তভোগী শিশু গৃহকর্মীকে রাখা হয়েছিল। আমরা যখন গ্রেফতার করি তখন ওই বাসায় রুপালির দুইটা বাচ্চা ছিল। তার স্বামী যেহেতু দেশের বাইরে থাকে তাই রুপালির সঙ্গেই কারাগারে আছে ওই দুই বাচ্চা।’

আসামি বিথী নাকি রুপালি- কার সন্তান দেখাশোনার জন্য শিশু গৃহকর্মীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল? জানতে চাইলে উত্তরা পশ্চিম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী রফিক আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘আসামি বিথী সাফিকুর রহমানের দ্বিতীয় স্ত্রী। তাদের বাসায় একটা বাচ্চা ছিল। কিন্তু বাচ্চাটা কার সেটা আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি।’ তবে কার বাচ্চা দেখাশোনার জন্য শিশু গৃহকর্মী মোহনাকে রাখা হয়েছিল- সেটা জানাতে না পারাটাও প্রশাসনের ব্যর্থতা বলে স্বীকার করেন ওসি।

যে বাচ্চা দু’টো কারাগারে আছে- তাদের মা কে? এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা তো এত গভীরে প্রবেশ করিনি। তারা সবাই তো জেলে আছে। তাদের মা কে?- দেখি এই উত্তর খুঁজে পাই কি না।’

কোন বাচ্চাকে দেখাশোনার জন্য শিশু গৃহকর্মীকে নিয়োগ দেওয়া হয়? জানতে চাইলে পুলিশের উত্তরা জোনের সহকারী কমিশনার সাদ্দাম হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘বিমানের এমডি সাফিকুরের দ্বিতীয় স্ত্রী বিথী। আমার জানা মতে তার চার বছরের এক সন্তান রয়েছে। তাকে দেখাশোনার জন্যই ১১ বছরের শিশু মোহনাকে গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

নির্যাতন করেছেন বিমানের এমডি ও তার স্ত্রী; তাহলে অন্য দুই গৃহকর্মীকে কি অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ছাড়া, সাফিকুর রহমানের বাসায় তো দু’টি বাচ্চা ছিল। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এই ঘটনায় অন্য দুই গৃহকর্মীর সংশ্লিষ্টতা থাকায় তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে বাচ্চা তো কোনো ফ্যাক্ট না, এটা হলো অন্য বিষয়। আর গৃহকর্মী রুপালির সঙ্গে কারাগারে কোনো বাচ্চা আছে কি না সেটা আদালত জানে।’

এর আগে, ১১ বছরের একশিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতনের অভিযোগে করা মামলায় গত মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) ভোর রাত ৩টা ৩৫ মিনিটে উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের ৭/সি রোডের বাসা থেকে বিমানের এমডি ড. সাফিকুর রহমান ও তার স্ত্রীসহ চারজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ওইদিন তাদের আদালতে তোলা হলে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

বিজ্ঞাপন

আরো

মেহেদী হাসান - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর