Friday 30 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

২ স্ত্রীর খরচ ও মানসিক চাপ সামলাতেই মিরপুরে অপহরণ নাটক

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২৩:১৩ | আপডেট: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:০৭

বস্তায় ভরে ‘অপহরণ’ নাটকের সিসিটিভি ফুটেজ ও ডিসি মো. মোস্তাক সরকার।

ঢাকা: ঋণের বোঝা, সন্তানের বিয়ে এবং দুই পরিবারের খরচের চাপ সামলাতে না পেরে পরিবার থেকে দূরে থাকতে আত্মগোপনের পরিকল্পনা করেছিলেন নজরুল ইসলাম (৫০)। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মেসে থাকা চাচাতো ভাইয়ের ছেলে মো. রিপনের (২৬) সহযোগিতায় নিজেকে বস্তায় ভরে ‘অপহরণ’ নাটক সাজান তিনি। পরে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদী থেকে তাঁকে উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় সহযোগিতার অভিযোগে রিপনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাতে মিরপুরে উপপুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিসি মো. মোস্তাক সরকার।

গ্রেফতার নজরুল ইসলাম ও সহায়তাকারী চাচাতো ভাইয়ের ছেলে মো. রিপন।

গ্রেফতার নজরুল ইসলাম ও সহায়তাকারী চাচাতো ভাইয়ের ছেলে মো. রিপন।

তিনি বলেন, গত ১১ সেপ্টেম্বর ভোরে পল্লবীর একটি ক্লিনিকের সামনে থেকে নজরুল ইসলাম কথিতভাবে অপহৃত হন। পরে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে পুলিশের সন্দেহ হয়, ঘটনাটি প্রকৃত অপহরণ নয়। তদন্তে বেরিয়ে আসে, নজরুল নিজেই আত্মগোপনের পরিকল্পনা করেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়,  নজরুল ইসলাম টাঙ্গাইলের মধুপুর থানার বেকার কোনা গ্রামের মো. শুকুর আলীর ছেলে। তিনি পল্লবীর দি স্যালভেশন আর্মি যক্ষ্মা ও কুষ্ঠ ক্লিনিকে প্রায় ১৬ থেকে ১৭ বছর ধরে নিরাপত্তাপ্রহরী হিসেবে কাজ করছেন। তার মাসিক বেতন প্রায় ১৭ হাজার টাকা। পাশাপাশি মেসে থাকা লোকজনের রান্নাবান্নার কাজও করতেন।

ডিসি মোস্তাক সরকার বলেন, গত ১০ সেপ্টেম্বর রাত ১০টায় নজরুল নাইট গার্ডের দায়িত্বে যোগ দেন। পরদিন কর্মস্থলে তাকে না পাওয়ায় কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে। সেখানে দেখা যায়, ভোর ৪টা ৪৭ মিনিটে এক ব্যক্তি সাদা প্লাস্টিকের বস্তায় করে নজরুলকে ক্লিনিকের প্রধান ফটকের সামনে নিয়ে আসেন। প্রায় এক ঘণ্টা পর ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটে নজরুল নিজেই বস্তা থেকে বের হয়ে গেটের সামনে বসেন। পরে ওই ব্যক্তির সঙ্গে রিকশায় করে সেখান থেকে চলে যান। ফুটেজে কোনো দৃশ্যমান জোরজবরদস্তি দেখা যায়নি।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে নজরুল জানান, দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক ও আর্থিক সংকটে ছিলেন তিনি। তার দুই স্ত্রী এবং দুই ঘরে এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। দুই পরিবারই টাঙ্গাইলে বসবাস করে। ১৭ হাজার টাকা বেতন থেকে প্রতি মাসে দুই পরিবারকে প্রায় ৩ হাজার টাকা করে দিতেন তিনি। বাকি টাকা দিয়ে ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতেন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার কয়েক দিন আগে প্রথম স্ত্রী রোকেয়া বেগমের সঙ্গে পারিবারিক বিষয় নিয়ে নজরুলের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তিনি স্ত্রীকে বলেন, ‘তুই কি চাস? আমি মইরা যাই?’ জবাবে স্ত্রী বলেন, ‘হ্যাঁ, তুই মইরা গেলেই আমি বাঁচি।’ স্ত্রীর এই কথায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং একপর্যায়ে আত্মহত্যার চিন্তা করেন। পরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে পরিবার ও আর্থিক সংকট থেকে দূরে থাকার জন্য আত্মগোপনের পরিকল্পনা করেন।

পুলিশ জানায়, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নজরুল তার মেসে থাকা চাচাতো ভাইয়ের ছেলে রিপনের সহযোগিতা নেন। ঘটনার দিন ভোর ৪টা ২১ মিনিটে রিপন সাদা বস্তায় নজরুলের কাপড়চোপড়ের ব্যাগ নিয়ে গার্ডরুমে ঢোকেন। এরপর নজরুল নিজেই বস্তার ভেতরে ঢোকেন। ভোর ৪টা ৩৫ মিনিটে রিপন তাঁকে বস্তাসহ প্রধান ফটকের কাছে নিয়ে যান। পরে অটোরিকশায় করে তাঁরা গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে যান।

সেখান থেকে নজরুল শ্যামলী পরিবহনের বাসে চট্টগ্রামের এ কে খান এলাকায় যান। সেখানে ‘রাসেল’ নামের এক পরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে কর্ণফুলী থানার ইছানগর এলাকায় তার বাসায় অবস্থান করেন। পরে ১৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে রাসেল তাকে ‘সি হার্ট-২’ নামের একটি ফিশিং জাহাজে বাবুর্চির কাজের ব্যবস্থা করে দেন। পরদিন সকালে ওই জাহাজে অভিযান চালিয়ে নজরুলকে উদ্ধার করে পুলিশ।

ডিসি মোস্তাক সরকার বলেন, নজরুলের ওপর আনুমানিক ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা ঋণ রয়েছে। বিভিন্ন উৎস ও সুদে নেওয়া ঋণের পাশাপাশি সম্প্রতি ব্যাংক থেকেও প্রায় ৩ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন তিনি। দ্বিতীয় ঘরের ছেলে মেরাজকে কিছুদিন আগে ঋণ করে বিয়ে দেওয়ায় তার আর্থিক চাপ আরও বেড়ে যায়। দুই পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানের বিয়ে এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধ—সব মিলিয়ে তিনি দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক ও পারিবারিক চাপে ছিলেন।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ, জিজ্ঞাসাবাদ ও অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাটি প্রকৃত অপহরণ নয়, বরং পূর্বপরিকল্পিত আত্মগোপন ও কথিত অপহরণ নাটক বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানান ডিসি মোস্তাক। তবে ঘটনাটির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চলছে। এর সঙ্গে অন্য কারও সম্পৃক্ততা কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর