ঢাকা: ব্যাংক ঋণের সুদহার ইস্যুতে দেশের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো পেশাদার ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে বলে কঠোর সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেছেন, সরকার যখন ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশ বেঁধে দিয়েছিল, তখন ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো প্রতিবাদ না করে বরং ‘পাপেট’ বা পুতুলের মতো আচরণ করেছে।
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) বনানীর একটি হোটেলে ‘ইমপ্লিক্যাশনস অব এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ফর ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রি : বাংলাদেশ পারসপেক্টিভ’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশ (আইসিসিবি) এ গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে।
গভর্নর বলেন, ‘ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ নির্ধারণের সময় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো চুপ ছিল, এমনকি হাততালিও দিয়েছিল। তারাই এটার দাবি করেছিল, চাপ দিয়েছিল।’ তিনি আরও বলেন, অর্থ পাচারের সময়েও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নীরবতা পুরো ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এভাবে আচরণ করলে গণতন্ত্র কখনো শক্তিশালী হয় না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আর কখনো ব্যাংক সুদহার ৬–৯ শতাংশে ফিরে যাবে না। অর্থনীতির উন্নয়ন ও এলডিসি থেকে উত্তরণ একসঙ্গে হতে হবে। ছোট সুবিধার জন্য বড় সুবিধা হাতছাড়া করা যাবে না।
বর্তমান সুদহার প্রসঙ্গে গভর্নর বলেন, ২০২০ সালের পর এই হার সবচেয়ে বেশি। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটি অস্বাভাবিক নয়। ২০২০ সালের আগে সুদহার আরও বেশি ছিল। ২০ বিলিয়ন ডলার অর্থ পাচার হয়েছে, খেলাপি ঋণ বেড়েছে-এর ক্ষতিপূরণ তো করতে হবে।
তিনি আরও জানান, আমানতের প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশে নেমে গেলেও এখন তা বেড়ে ১১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যার প্রভাব সুদহারে পড়েছে। সুশাসন, তদারকি ও গ্রাহক আস্থা বাড়লে সুদহার আবার কমে আসবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর উদ্দেশে গভর্নর বলেন, ‘আমরা পুতুল সংগঠন চাই না, আমরা পেশাদার ব্যবসায়ী সংগঠন চাই। আমরা তাদের কাছ থেকে সত্য কথা শুনতে চাই।’
অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে ঋণের বর্তমান সুদহার বেশি বলে দাবি করা হয়।
আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমানের সঞ্চালনায় আয়োজিত এ আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবিব। বক্তব্য দেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংক (বিএবি) ও ঢাকা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার, ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী সিমিন রহমান, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমানসহ ব্যাংক ও ব্যাবসা খাতের শীর্ষ নেতারা।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের এপ্রিল মাসে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অর্থমন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশ নির্ধারণ করেন। ওই বৈঠকে তখনকার গভর্নর ফজলে কবিরের অংশগ্রহণ নিয়েও সমালোচনা হয়েছিল। পরবর্তীতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে ২০২৩ সালের শেষ দিকে সুদহারের সীমা শিথিল করা শুরু হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে সরকারের পট পরিবর্তনের পর গভর্নরের দায়িত্ব নিয়ে আহসান এইচ মনসুর ঋণ সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা তুলে দেন। সর্বশেষ মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হলে ব্যাংক ঋণের সুদহার বর্তমানে ১৫–১৬ শতাংশে পৌঁছেছে।