ঢাকা: তারল্য সংকটে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংককে ঈদের আগে গ্রাহকদের বাড়তি অর্থ উত্তোলন চাহিদা মেটাতে ১ হাজার কোটি টাকা জরুরি তহবিল সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
জানা গেছে, ১১ দশমিক ৫ শতাংশ সুদে ৯০ দিনের জন্য এ তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ঈদকে সামনে রেখে ব্যাংকিং খাতে সাধারণত নগদ অর্থ উত্তোলনের চাপ বেড়ে যায়। সে প্রেক্ষাপটে ক্যাশ ফ্লো স্বাভাবিক রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে আবেদন করে ন্যাশনাল ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সিনিয়র কর্মকর্তা জানান, ন্যাশনাল ব্যাংক তারল্য সংকটের কারণে গ্রাহকদের অর্থ সময়মতো পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছিল। তহবিল ঘাটতির বিষয়টি জানিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চিঠি দেওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে এ সহায়তা দেওয়া হয়।
ন্যাশনাল ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘ঈদের আগে গ্রাহকদের টাকা তোলার চাপ বেড়ে যায়। কিন্তু আমানত প্রবাহ ও ঋণ আদায়ের বর্তমান পরিস্থিতিতে তারল্য ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা নেওয়া হয়েছে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরেক কর্মকর্তা জানান, ডিমান্ড প্রমিসরি (ডিপি) নোট’-এর বিপরীতে এ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘এ ধরনের তারল্য সহায়তা বাজারে অর্থের জোগান বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।’
বর্তমানে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে সংকোচনশীল অবস্থান বজায় রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে চলতি বছরের প্রথমার্ধের জন্য নীতি সুদহার ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে উচ্চ সুদে তারল্য সহায়তা দেওয়া হলেও তা মুদ্রাস্ফীতির লক্ষ্য অর্জনের সঙ্গে কিছুটা সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিআইবিএম এর মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব। সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংককে সহায়তা না দিলে সেটি বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তবে তারল্য সহায়তা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে টাইট মুদ্রানীতি কার্যকর রাখতে হলে বাজারে অর্থের প্রবাহ সীমিত রাখতে হয়। কিন্তু বিপরীতে বড় অঙ্কের তারল্য সহায়তা দিলে সেই নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে।’
দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জর্জরিত ন্যাশনাল ব্যাংক। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী সিকদার গ্রুপের হাতে। গ্রুপটির চেয়ারম্যান জয়নুল হক সিকদারের মৃত্যুর পর পারিবারিক দ্বন্দ্বে ব্যাংকের অবস্থা আরও নাজুক হয়।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকটির পর্ষদ ভেঙে দিয়ে চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় সৈয়দ ফারহাত আনোয়ারকে। সে সময়-এর সঙ্গে একীভূতকরণের আলোচনা শুরু হলেও পরে সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে বাংলাদেশ ব্যাংক।
২০২৪ সালের মে মাসে নতুন পর্ষদ গঠনের পর ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপের হাতে যায়। তবে সরকার পরিবর্তনের পর পুনরায় পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয় এবং পুরনো উদ্যোক্তা ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু চেয়ারম্যান হিসেবে ফেরেন।
এরপর থেকেই ব্যাংকটি একাধিকবার তারল্য সংকটে পড়ে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে জরুরি সহায়তা নিতে হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ঈদ-পরবর্তী সময়ে ন্যাশনাল ব্যাংকের আমানত প্রবাহ ও ঋণ আদায় পরিস্থিতির ওপরই নির্ভর করবে তারল্য পরিস্থিতি কতটা স্বাভাবিক হয়। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্যও চ্যালেঞ্জ হবে—আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা।