Wednesday 11 Mar 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

ভবদহের স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনে ৩ প্রকল্প, সুফল নিয়ে সংশয়

ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট
১১ মার্চ ২০২৬ ১৬:১১ | আপডেট: ১১ মার্চ ২০২৬ ১৭:১২

ভবদহে জলাবদ্ধতার কারণে মানুষকে যত্রতত্র ব্যবহার করতে হচ্ছে বাঁশের সাঁকো।

যশোর: যশোর-খুলনার ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে তিনটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশাবাদী হলেও সুফল পাওয়া নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

উল্লেখ্য, যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর, কেশবপুর এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার অংশ নিয়ে গঠিত ভবদহ অঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমেও ব্যাপক জলাবদ্ধতার সমস্যা থাকে। দুই জেলার মোট পাঁচ উপজেলার মানুষ চার দশকের বেশি সময় ধরে স্থায়ী জলাবদ্ধতার শিকার। পলি জমে মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশনও ব্যাহত হচ্ছে।

সরেজমিনে এই পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করা গেছে।

বিজ্ঞাপন

হাঁটুসমান পানিতে ডুবে থাকা উঠান, শ্যাওলায় ভরা পরিবেশ—দেখলে মনে হয় পরিত্যক্ত বাড়ি। অথচ সাত মাসের বেশি সময় ধরে এমন পরিস্থিতিতেই পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন রেখা হালদার। বাড়িতে ঢোকার একমাত্র পথ বাঁশের সাঁকো। ঘরের ভেতরের পানি কিছুটা কমলেও উঠানে জমে থাকা পানি, ডুবে থাকা টিউবওয়েল ও টয়লেট মিলিয়ে চরম দুর্ভোগে দিন কাটছে মনোহর নগরের এই পরিবারের।

রেখা হালদার বলেন, ‘এখন শুষ্ক মৌসুম, তবু বাড়িতে হাঁটুসমান পানি। বর্ষায় উঠানে গলা পানি হয়, ঘরের ভেতরেও পানি ঢুকে পড়ে। রান্না, চলাফেরা, গরু-ছাগল আর ছোট বাচ্চা নিয়ে খুব কষ্টে থাকতে হয়। এভাবে জীবনযাপন করা যায় না।’

বাগডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা তমা শিকদার বলেন, ‘গত আষাঢ় মাসে পানি এসেছে। সেই থেকে এই পানির মধ্যেই বসবাস করছি। ফসল হচ্ছে না, নানা সমস্যার মধ্যে দিন কাটছে।’

মনোহর নগরের বিউটি বৈরাগী বলেন, ‘আমাদের বাড়ির উঠানের মাটি শেষ কবে দেখেছি মনে নেই। বছরের পর বছর পানি জমে থাকে। আমরা এই জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি চাই।’

এ বিষয়ে ভবদহ আন্দোলনের নেতা শিবপদ জানান, নদী খননের উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানিয়েছিলেন। তবে তার মতে, নদী কাটার পাশাপাশি টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (টিআরএম) চালু না করলে এবং ধারাবাহিকভাবে বিলে বিলে টিআরএম বাস্তবায়ন না হলে নদী খনন কার্যকর হবে না।

আন্দোলনের আরেক নেতা অনিল বিশ্বাস জানান, নদী খনন, সেচ ও বাঁধ নির্মাণের প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। তার মতে, এখানে নতুন সেচ প্রকল্প নয়, বরং নদী দখলমুক্ত করে সঠিকভাবে খনন এবং টিআরএম চালু করলেই জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।

ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ জানান, দীর্ঘ আন্দোলনের পর বিগত সরকারের আমলে আমডাঙ্গা খাল সংস্কার, নদী ও খাল খনন এবং টিআরএম চালুর প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এক বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হয়নি। নদী খনন প্রকল্পের বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশের কথা থাকলেও তা হয়নি। এতে প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে মানুষের মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া, তিনি দ্রুত টিআরএম বাস্তবায়নের দাবিও জানান।

এদিকে, যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী জানান, দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে ২৬৮ কোটি টাকার দু’টি প্রকল্পে নদী ও খাল পুনঃখননের কাজ শুরু হয়েছে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ছয়টি নদীর ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার পুনঃখনন চলছে। পাশাপাশি ৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৪টি খাল পুনঃখনন এবং সেচ সুবিধা সম্প্রসারণের কাজ চলছে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ৪৯ কোটি ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ২ দশমিক ৭০ কিলোমিটার আমডাঙ্গা খাল সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খননের পর পলি ব্যবস্থাপনার জন্য প্রায় ২৮০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তবে চার দশকের এই সমস্যার সমাধানে অতীতে হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও কার্যকর সমাধান পাওয়া যায়নি বলে জানা যায়।

বর্তমানে অভয়নগরের ভবদহ ২১-ভেন্ট স্লুইসগেট থেকে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার কাশিমপুর পর্যন্ত হরি নদীর ১৫ কিলোমিটার, কাশিমপুর থেকে কুলবাড়িয়া পর্যন্ত তেলিগাতী নদীর ৫ কিলোমিটার, মনিরামপুরের বাকোশপোল থেকে কেশবপুর বরেঙ্গা পর্যন্ত হরিহর নদীর ৩৫ কিলোমিটার, বরেঙ্গা থেকে কাশিমপুর পর্যন্ত আপার ভদ্রা নদীর ১৮ দশমিক ৫০ কিলোমিটার, অভয়নগরের গোঘাটা থেকে ভবদহ ২১-ভেন্ট স্লুইসগেট পর্যন্ত টেকা নদীর ৭ কিলোমিটার এবং মনিরামপুরের নেহালপুর বাজার এলাকায় শ্রী নদীর ১ কিলোমিটার পুনঃখননের কাজ চলছে।

বিজ্ঞাপন

আরো

সম্পর্কিত খবর