ঢাকা: চলতি অর্থবছরে আমদানি-রফতানির অসামঞ্জস্যতায় দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৩৮০ (১৩ দশমিক ৮০ বিলিয়ন) কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল এক হাজার ১৭৫ (১১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন) কোটি ডলার। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ১৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে রফতানি হয়েছে মোট দুই হাজার ৬০৯ কোটি ডলারের পণ্য। বিপরীতে একই সময়ে আমদানি হয়েছে তিন হাজার ৯৮৯ কোটি ডলারের পণ্য। ফলে এই সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৩৮০ কোটি ডলার। এ সময় আমদানি কিছুটা বেড়েছে। আর বিপরীতে রফতানিতে দেখা গেছে স্থবিরতা। সাত মাসে আমদানি বেড়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। একই সময়ে রফতানি কমেছে প্রায় ১ দশমিক ১ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চলতি রমজান মাসকে কেন্দ্র করে আমদানি বাড়ার কারণে ব্যয় বেশি হয়েছে। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়া ও প্রধান বাজারগুলোতে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে দেশের রফতানি প্রবৃদ্ধির গতি ধীর ছিল। বিশেষ করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে মূল্যস্ফীতি ও ভোক্তাদের ব্যয় সংকোচনের প্রভাব পড়েছে পোশাকসহ বিভিন্ন ভোগ্য পণ্যের অর্ডারে। এ কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েই চলছে।
বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জানান, বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলে এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণে উদ্যোগ জোরদার করা গেলে আগামী মাসগুলোতে রফতানি বাড়তে পারে। একইসঙ্গে পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, উৎপাদন দক্ষতা উন্নয়ন এবং টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর জোর দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, দেশের রফতানি আয়ের বড় অংশ তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই খাতে অর্ডার কমলে সামগ্রিক রফতানিতেও প্রভাব পড়ে। পাশাপাশি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, গ্যাস সরবরাহে অনিশ্চয়তা এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতায় চাপ সৃষ্টি করছে।
তথ্য বলছে, অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বাংলাদেশ থেকে রফতানি আয় কমেছে। গত অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে রফতানি আয় ছিল ২৬ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার, যা চলতি অর্থবছরের একই সময়ে কমে দাঁড়িয়েছে ২৬ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে আমদানি ব্যয় ৩৮ দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩৯ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, ‘বাণিজ্যে পরিবর্তনের কারণেই মূলত এই ঘাটতি বাড়ছে। আমদানি বাড়া ও রফতানি কমার কারণে মূলত বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে। তবে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও আলোচ্য সময়ে দেশের চলতি হিসাবে (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) ঘাটতি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘চলমান যুদ্ধের প্রভাব মার্চ থেকে দৃশ্যমান হতে পারে। ফলে আগামী দিনগুলোতে লেনদেনের ভারসাম্য পরিস্থিতির অবনতি ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। এটি বিনিময় হার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।’ বিনিময় হারের অস্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংরক্ষণে বাংলাদেশ ব্যাংককে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করেন ড. জাহিদ।
তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে চলতি হিসাবে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৮১ মিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ভারত ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো বাণিজ্য চুক্তি, অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সুবিধার কারণে অনেক ক্ষেত্রে বেশি প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের রফতানি প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। রফতানি পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং উচ্চমূল্যের পণ্যের প্রবেশ বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতেও বাণিজ্য ঘাটতির চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বাংলাদেশের আর্থিক হিসাবে ২ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত রেকর্ড করা হয়েছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩৩১ মিলিয়ন ডলার। তথ্য বলছে, আলোচ্য সময়ে দেশের সার্বিক লেনদেনের ভারসাম্যেও উন্নতি হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে দেশের সার্বিক লেনদেনের ভারসাম্যে ২ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত হয়েছে, যেখানে গত বছরের একই সময়ে ১ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার ঘাটতি ছিল।