মালয়েশিয়া থেকে ফিরে: কুয়ালালামপুরের বুকিত বিনতাংয়ে একটি আবাসিক হোটেলের ম্যানেজার আবু তাহের। তিনি ঢাকার কোনাপাড়া থেকে দুই বছর আগে শ্রমিক ভিসায় কুয়ালালামপুরে পাড়ি জমান। এখন তিনি সেখানে রীতিমতো যুদ্ধ করে টিকে আছেন। তার সঙ্গে কথা হয় সারাবাংলার এই প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর ভিসা রিন্যু করতেই লাগে ছয় হাজার রিঙ্গিত। অথচ, মাসে বেতন পাই ১৭০০ রিঙ্গিত। আবার এর মধ্যে রয়েছে খাওয়ার খরচ; যদিও থাকার খরচ মালিক দেয়। বাংলাদেশ থেকে আসতে খরচ হয়েছে আট লাখ। এখন আপনিই বলেন, আমি কত টাকা দেশে পাঠাতে পারব?’
মালয়েশিয়ায় কর্মরত প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রায় সবারই এমন অভিযোগ। জানা গেছে, যেখানে এশিয়ার আরেক দেশ নেপালের শ্রমিকদের মালয়েশিয়ায় যেতে খরচ হয় মাত্র ৮০ হাজার টাকা, সেখানে বাংলাদেশ থেকে যেতে লাগে পাঁচ থেকে আট লাখ টাকা । অথচ দুই দেশের শ্রমিকদের বেতন কিন্তু একই। মালয়েশিয়ায় ঢোকার পর সব দেশের শ্রমিকের বেতন শুরু হয় এক হাজার ৭০০ রিঙ্গিত দিয়ে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫১-৫২ হাজার টাকা। আর এর একবছর পর থেকেই শ্রমিকদের ভিসা রিন্যু করতে লাগে ছয় হাজার রিঙ্গিত।
মালয়েশিয়ান প্রবাসীদের অভিযোগ, বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রফতানির খচরটা বেশি, সেটা কমাতে হবে। না হলে একজন শ্রমিক কোনোভাবেই দেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারবেন না। কারণ, মাসিক ১৭০০ রিঙ্গিত বেতনে আসার খরচ উঠাবে, নাকি বছর বছর ছয় হাজার রিঙ্গিত দিয়ে ভিসা রিন্যু করবে? এ নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন মালয়েশিয়ার বাংলাদেশি প্রবাসীরা। সম্প্রতি মালয়েশিয়ান সরকারের প্রতিও প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকরা দাবি তুলেছেন যে, তাদের ন্যূনতম বেতন তিন হাজার রিঙ্গিত করা হোক। তবে এ বিষয়ে মালয়েশিয়ান সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো ‘সবুজ সংকেত’ পাওয়া যায়নি।
কুমিল্লার আরাফাত হোসেন কাজল, বুকিত বিনতাংয়ে একটি খাবারের হোটেলে কাজ করেন। সারাবাংলার এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশি প্রবাসীরা বিপদে পড়লে অ্যাম্বাসিতে জানানোর পরও কোনো খোঁজ নেওয়া হয় না। অনেক সময় নির্র্যতন করা হলেও তারা আসেন না। অথচ নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার ও থাই শ্রমিকরা যেকোনো বিপদে পড়লেই অ্যাম্বাসি এসে হাজির। তারা এসেই মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে প্রতিবাদ জানায়। ফলে ওইসব দেশের শ্রমিকরা আলাদা একটা মর্াদায় থাকেন। কিন্তু বাংলাদেশি শ্রমিকদের শত বিপদেও অ্যাম্বাসির কাউকে পাশে পাওয়া যায় না।’
কুয়ালালামপুরের বুকিত বিনতাংয়ে সাউথ ইন্ডিয়ান প্রবাসীর খেলনার দোকানে কাজ করেন নরসিংদীর আব্দুল আজিজ। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘শুনতাছি মালয়েশিয়া সরকার নতুন করে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক আনবে। শ্রমিক আসার খরচ কমাতে হবে। না হলে এখানে যে বেতন-ভাতা পাওয়া যায়, তা দিয়ে দৈনন্দিন খরচ মিটিয়ে নতুন করে প্রতিবছর ভিসা রিন্যু করা সম্ভব হয় না। ফলে অনেকে অবৈধ হয়ে পালিয়ে বেড়ায়। আবার অনেকে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে জেল খাটে। কিন্তু ওই সময় অ্যাম্বাসি থেকে তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না। তবে অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রদূতরা মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে বসে শ্রমিকের স্বার্থ সুরক্ষায় কাজ করে।’ এক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে বলে অভিযোগ তার।
জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে যত শ্রমিক যায় তার বেশিরভাগই পাম বাগানে কাজ করেন। অল্প কিছু সংখ্যক আছেন যারা মার্কেট, দোকান বা হোটেল রেস্তোরাঁয় কাজ করে থাকেন। তবে প্রবাসী শ্রমিকদের বেতন আশানুরূপ না হওয়ায় খুব বেশি পারিবারিক স্বচ্ছলতা আনতে পারেন না তারা। তাদের দাবি,কয়েকবছর আগে যারা মালয়েশিয়ায় এসেছেন তাদের বেশিরভাগেরই তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছে। যদিও খরচ এতটা লাগেনি। প্রকৃত খরচ লেগেছিল মাত্র ৬০ হাজার টাকা। বাকি টাকা দালাল ও এজেন্সির পকেটে গেছে। এবারও যদি কোম্পানি সবকিছু বহন করে তাহলে খরচ অনেক কমে হওয়ার কথা। তাই এ ক্ষেত্রে সরকারের মনিটরিং জরুরি।
মালয়েশিয়ায় গমনেচ্ছুকদের অভিযোগ, মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানো হবে- সরকারের পক্ষ থেকে এমন ঘোষণা দেওয়ার পর পরই এজেন্সিগুলো সক্রিয় হয়েছে। তারা কোথাও কোথাও পাসপোর্টসহ কাগজপত্র নেওয়াও শুরু করেছে। তাতে যা শোনা যাচ্ছে, এবার খরচ আরও বেশি লাগবে। সেটার পরিমাণ ছয় থেকে আট লাখ টাকা। এর কমে কেউ যেতে পারবে না বলেও প্রচার করা হচ্ছে। তাই যদি হয়, তাহলে জনশক্তি রফতানি কমে যাবে। কারণ, মালয়েশিয়ার মতো দেশে এত টাকা দিয়ে যাওয়ার লোক এখন খুব একটা পাওয়া যাবে না।
অনেক এজেন্সিও প্রায় একই সুরে কথা বলছেন। বনানীর আল শামস এজেন্সির সহকারী ম্যানেজার এনামুল হক শামীম সারাবাংলাকে বলেন, ‘টাকা বেশি নিয়ে এজেন্সিগুলোর লাভ নেই। বরং, কম টাকায় বেশি শ্রমিক পাঠাতে পারলে লাভ বেশি। এবার মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর জন্য খরচ বেশি পড়ে যাবে।’ তবে কম খরচে যাতে শ্রমিক পাঠানো যায় সেজন্য সরকারের সঙ্গে এজেন্সিগুলোর বৈঠক চলমান রয়েছে বলে জানান তিনি।
ফাহিম ওভারসিজের ম্যানেজার রুহুল আমিন সারাবাংলাকে বলেন, ‘কয়েকবছর ধরে শ্রমিক পাঠানো যাচ্ছে না। এবার আশার আলো দেখা যাচ্ছে। কিন্তু টাকা বেশি লাগার আশঙ্কায় অনেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এরকম হলে এজেন্সিগুলোর যেমন লোকসান হবে, তেমনি রাজস্ব হারাবে সরকারও। কাজেই সাধ্যের মধ্যে যাতে শ্রমিকরা মালয়েশিয়া যেতে পারেন সেজন্য কাজ চলছে।’
জানতে চাইলে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) জামিল আহমেদ সারাবাংলাকে বলেন, ‘মাত্র তিন মাস ধরে কাজ করছি আমি। শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষা করাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য। বর্তমানে এটি নিয়েই কাজ চলছে। কম টাকায় বা বিনা টাকায় যাতে শ্রমিকরা বিদেশে যেতে পারেন, সে করণীয় ঠিক করতে কাজ চলমান। সেই সঙ্গে শুধু মালয়েশিয়া নয়, সারাবিশ্বে কীভাবে দক্ষ জনশক্তি পাঠানো যায়, সেটির ওপরও জোর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’
শ্রমিক পাঠাতে টাকার পরিমাণ কমানো হবে কি না? জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর সারাবাংলাকে বলেন, ‘প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রবাসী শ্রমিকদের স্বার্থেই কাজ করে যাচ্ছে। শ্রমিকরা যাতে ভোগান্তি ছাড়াই অল্প পয়সায় বা বিনা টাকায় বিদেশে যেতে পারে সে লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। মালয়েশিয়া যেতে টাকার পরিমাণ বেঁধে দেওয়া হয়নি। এজেন্সিগুলো যাতে যৌক্তিক পরিমাণের বাইরে কোনো টাকা নিতে না পারে সেজন্য সজাগ থাকতে হবে। আমরাও এজেন্সি মালিকদের বলে দিয়েছি, কোনোরকম ব্যত্যয় ঘটলে লাইসেন্স স্থগিত অথবা বাতিল করা হবে।’