ঢাকা: দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নারীর অংশগ্রহণ ধীরে ধীরে বাড়ছে। তবে কর্মজীবনের শুরুতে নারীর উপস্থিতি তুলনামূলক বেশি থাকলেও পদোন্নতির সঙ্গে সঙ্গে তা কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে উচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীর প্রতিনিধিত্ব এখনো বেশ কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকে মোট ২ লাখ ১৭ হাজার ৮১৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে নারী ৩৫ হাজার ৯৭১ জন। অর্থাৎ ব্যাংক খাতের মোট জনবলের ১৬ দশমিক ৫১ শতাংশ নারী।
ব্যাংকগুলোর মধ্যে সংখ্যার দিক থেকে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে নারী কর্মীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এসব ব্যাংকে ২৩ হাজার ৫২৪ জন নারী কাজ করছেন, যা ব্যাংক খাতে মোট নারী কর্মীর প্রায় ৬৫ শতাংশ। তবে মোট কর্মীর তুলনায় নারী অংশগ্রহণের হার সবচেয়ে বেশি বিদেশি ব্যাংকগুলোতে—২৪ দশমিক ৮১ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকে এ হার ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ এবং বিশেষায়িত ব্যাংকে ১৬ দশমিক ১৬ শতাংশ।
নারীর কর্মসংস্থান বাড়লেও নেতৃত্বের পর্যায়ে তাদের অংশগ্রহণ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে নারীর অংশগ্রহণ মাত্র ১৩ দশমিক ১৪ শতাংশ। প্রবেশ পর্যায়ে নারী কর্মীর হার ১৬ দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং মধ্যম পর্যায়ে ১৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ। কিন্তু উচ্চপদে এ হার কমে দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৫৫ শতাংশে।
অর্থাৎ চাকরির শুরুতে নারীর উপস্থিতি যে হারে রয়েছে, ক্যারিয়ারের পরবর্তী ধাপে সেই উপস্থিতি ধরে রাখা যাচ্ছে না। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নারীর প্রতিনিধিত্বও কম থাকছে।
বয়সভিত্তিক তথ্যেও একই প্রবণতা দেখা যায়। ৩০ বছরের কম বয়সী কর্মকর্তাদের মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ ২১ দশমিক ১০ শতাংশ। তবে ৫০ বছরের বেশি বয়সে তা কমে ১১ শতাংশে নেমে আসে। বিদেশি ব্যাংকগুলোতে নারী কর্মীদের চাকরি পরিবর্তনের হারও তুলনামূলক বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত বছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের তুলনায় চলতি বছরের জানুয়ারি-জুন সময়ে ব্যাংক খাতে নারী কর্মীর সংখ্যা ৯১০ জন বেড়েছে। ৩৫ হাজার ৬১ জন থেকে বেড়ে এ সংখ্যা হয়েছে ৩৫ হাজার ৯৭১ জন।
কর্মপরিবেশে নারীদের জন্য কিছু সুবিধা চালু রয়েছে। দেশের সব তফসিলি ব্যাংকে ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি কার্যকর রয়েছে। যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সচেতনতার নীতিমালাও রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ৩৭টি ব্যাংকে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে। ৩৬টি ব্যাংক কর্মঘণ্টা শেষে নারী কর্মীদের পরিবহন সুবিধা দিচ্ছে। আর ৪৯টি ব্যাংক জেন্ডার সমতা নিয়ে সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণের আয়োজন করছে।
তবে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আগের ছয় মাসের তুলনায় শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র, কর্মস্থল-পরবর্তী পরিবহন ও প্রশিক্ষণের মতো কিছু সুবিধা কমেছে।
ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও নারীর অংশগ্রহণ সীমিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৩৫টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মোট কর্মীর ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ নারী। অর্থাৎ প্রতি চারজন পুরুষ কর্মীর বিপরীতে নারী কর্মী রয়েছেন প্রায় একজন।
এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে নারীর অংশগ্রহণ ১৪ দশমিক ৭৮ শতাংশ। প্রবেশ পর্যায়ে নারীর উপস্থিতি ১৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ হলেও মধ্যম পর্যায়ে তা কমে ১২ দশমিক ৮৬ শতাংশ এবং উচ্চপদে মাত্র ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।
অর্থাৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানেও চাকরির প্রবেশ পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ তুলনামূলক বেশি, কিন্তু নেতৃত্বের পর্যায়ে গিয়ে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সবকটিতেই ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটির ব্যবস্থা রয়েছে। ৩৪টি প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ নীতিমালা রয়েছে। ২১টি প্রতিষ্ঠান জেন্ডার সমতা নিয়ে প্রশিক্ষণ দেয় এবং ২৩টি প্রতিষ্ঠানে নারী কর্মীদের পরিবহন সুবিধা রয়েছে। তবে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের সুবিধা রয়েছে মাত্র চারটি প্রতিষ্ঠানে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে বিভিন্ন নীতিগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে নারীর প্রতিনিধিত্ব এখনো সীমিত।
কর্মজীবী নারীদের কর্মপরিবেশ আরও সহায়ক করতে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র, নিরাপদ পরিবহন ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, জেন্ডার সমতা নিশ্চিত করতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এসব সূচক নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও উৎসাহ দেওয়ার কার্যক্রমও অব্যাহত থাকবে।