Thursday 22 October 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment
English

হিমাগারে আলুর পাহাড় / একযুগে লোকসান ৭ বার, এবার ক্ষতি ৫ হাজার কোটি টাকা

রাব্বী হাসান সবুজ, ডিস্টিক্ট করেসপন্ডেন্ট
২২ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৩৭

আলু তুলে হিমাগারে নেওয়া হয় সংরক্ষণের জন্য। ছবি: সংগৃহীত

রংপুর: আলুর বাম্পার ফলন আর বাজারে দরপতনের চাপে বিপর্যস্ত উত্তরাঞ্চলের আলুচাষিরা। হিমাগারে সংরক্ষিত আলুর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এখনো বিক্রি না হওয়ায় এবং নতুন মৌসুমের আলু চাষ শুরু হওয়ায় চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তারা। বর্তমান বাজারদরে কেজিতে ১০-১১ টাকা লোকসান ধরে শুধু রংপুর বিভাগের উৎপাদিত আলুতেই কৃষকদের সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।

কৃষি বিভাগ জানায়, এবছর রংপুর বিভাগে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬১৬ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ৫১ লাখ ৭৬ হাজার ৬৮৭ টন আলু। ১২৪টি হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছে মাত্র ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৫৯২ টন, যা মোট উৎপাদনের ২৩ দশমিক ১ শতাংশ। সংরক্ষিত আলুর ৭৩ দশমিক ৮ শতাংশ (৮ লাখ ৮২ হাজার ২৮৮ টন) এখনো হিমাগারে পড়ে আছে। এ ছাড়া, হিমাগার গেটে আলু বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি মাত্র ১১-১৪ টাকায়, যেখানে উৎপাদন খরচই ১৭-১৮ টাকা। সেক্ষেত্রে একজন কৃষকের ৬১ কেজির বস্তায় লোকসান ৮০০ টাকা।

বিজ্ঞাপন

রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের কৃষক মিজানুর রহমানের সঙ্গে কথা হয় সারাবাংলার এই প্রতিবেদকের। তিনি জানান, এবার ৪৯ বিঘা জমিতে আলু আবাদ করেছিলেন। ৬১ কেজির ৫ হাজার ২০০ বস্তা আলু হিমাগারে রাখা অবস্থায় ৩ হাজার ১৪২ বস্তা বিক্রি করে পেয়েছেন ১৪ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। কিন্তু হিমাগার ভাড়া ও অন্যান্য খরচ বাদে অবশিষ্ট আলু থেকে যে টাকা উঠবে, তা নিয়ে তিনি গভীর সংশয়ে আছেন। তার হিসাবে হিমাগার থেকে আলু তোলাসহ খরচ হয়েছে কেজিতে সাত টাকা। এখন দাম ১১-১৪ টাকায় নেমে আসায় প্রতি কেজিতে ১৫-১৬ টাকা লোকসানের মুখে তিনি। আতাউর রহমানের মতো অনেক কৃষকই আলু তোলাই বন্ধ রেখেছেন।

শুধু আতাউর নন, রংপুর নগরীর নগরমীরগঞ্জ এলাকার কৃষক জসিম উদ্দিনও দু’টি হিমাগারে ৫০০ বস্তা আলু রেখেছেন। তিনিও একই হিসাবে বলছেন, ‘এ দামে আলু তুললে কেজিতে সাড়ে ১৫ থেকে ১৬ টাকা লোকসান হবে।’

এক যুগে সাত বারই লোকসান

রংপুরের কৃষকের কাছে আলু একসময় ‘নগদ টাকার ফসল’ হলেও গত এক যুগে তা আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ও কৃষি বিপণন অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ১২ বছরের মধ্যে সাত বছরই আলু চাষে লোকসান গুনতে হয়েছে কৃষকদের। গতবছরও (২০২৫) লোকসানের কারণে কৃষকরা হিমাগার থেকে প্রায় চার লাখ বস্তা আলু তোলেননি, যাতে তাদের প্রায় ৬০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়।

যে কারণে সংকট

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই সংকটের পেছনে তিনটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, উদ্বৃত্ত উৎপাদন। দেশে আলুর বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৮৯ লাখ টন, অথচ গত মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ১২ লাখ টন, যা চাহিদার চেয়ে প্রায় ২২ লাখ টন বেশি। দ্বিতীয়ত, সীমিত সংরক্ষণ ক্ষমতা। রংপুর বিভাগে মোট উৎপাদনের মাত্র ২৩ শতাংশ আলু হিমাগারে রাখার সুযোগ আছে। তৃতীয়ত, অযৌক্তিক হিমাগার ভাড়া। কৃষকদের অভিযোগ, হিমাগার মালিকরা কেজিপ্রতি ছয়-সাত টাকা ভাড়া নিচ্ছেন, যা কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত কমিটির সুপারিশের চেয়ে অনেক বেশি।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

এই পরিস্থিতিতে সরকার কোল্ড স্টোরেজ গেটে আলুর সর্বনিম্ন দর কেজিপ্রতি ২২ টাকা নির্ধারণ এবং ৫০ হাজার টন আলু সরকারি উদ্যোগে কেনার ঘোষণা দিয়েছিল। তবে কৃষকদের অভিযোগ, এই ঘোষণা বাস্তবায়িত হয়নি এবং তারা প্রণোদনাও পাননি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ভর্তুকি নয়, আলুর বহুমুখী ব্যবহার বাড়ানো, রফতানি সম্প্রসারণ এবং আলুভিত্তিক শিল্পকারখানা গড়ে তোলার মাধ্যমেই এই সংকট থেকে দীর্ঘমেয়াদে উত্তরণ সম্ভব। বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু সারাবাংলাকে বলেন, ‘সরকার কৃষককে ভর্তুকি দিক, প্রয়োজনে কিছু আলু কিনে নিক।’

কৃষি অর্থনীতিবিদ রায়ান আহমেদ রাজুর মতে, ‘কৃষকের হিমাগার ভাড়ার ৫০ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়া যেতে পারে, অথবা আলুচাষিকে মূল্য সহায়তা দিয়ে লোকসান থেকে রক্ষা করা যেতে পারে।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, কৃষকদের পরিকল্পিতভাবে আলু চাষ করতে হবে এবং বৈচিত্র্য আনতে হবে। শুধু আলুর ওপর নির্ভর না করে ভুট্টা, সবজি বা ধান চাষের দিকেও নজর দিতে হবে, যাতে এক ফসলে লোকসান হলে অন্য ফসলে তা পুষিয়ে নেওয়া যায়।

সারাবাংলা/পিটিএম
বিজ্ঞাপন

খুলনায় যুবককে গুলি করে হত্যা
২২ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:৪৩

আরো

সম্পর্কিত খবর