ঢাকা: মাদক কারবারিদের শক্তি হচ্ছে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা, তাই দেশ থেকে মাদক সমস্যা সমাধানে সবার আগে রাজনৈতিক কমিটমেন্টও প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম।
রোববার (২৫ জানুয়ারি) সকাল ১১টায় রাজধানীর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের কনফারেন্স হলে বাংলাদেশে মাদক অপব্যবহারকারী ব্যক্তিদের সংখ্যা, ধরণ ও সংশ্লিষ্ট কারণগুলো নিয়ে জাতীয় পর্যায়ের গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শাহিনুল আলম বলেন, ‘দেশে মাদক সেবনকারী ৮২ লাখ মানুষ, যার মধ্যে বেশিরভাগই তরুণ। দেশে এই সংখ্যাটা এটাই বেশি যে ভয় পাবার মতো। প্রায় অর্ধেক মানুষ যারা মাদক গ্রহণ করছেন তারা চাচ্ছেন যে এটা থেকে বেরিয়ে আসতে। তারা চেষ্টা করছেন, আবার ব্যর্থও হচ্ছেন। আমরা যারা এই সমাজের মধ্যে আছি এরা তো আমাদের সমাজেরই অংশ। মাদক এতটাই বিস্তৃতি লাভ করেছে যে একেবারে গ্রামগঞ্জ পর্যন্ত চলে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘আমার বাচ্চা যখন স্কুলে পড়ে ইংলিশ মিডিয়ামের কোচিং সেন্টারে যায় আমি কয়েকজনকে দেখতাম যে সবসময় বসে থাকে মায়েরা। একজন মাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম আপনি কি প্রতিদিনই আসেন, বলে আমি প্রতিদিনই আসি। কেন ছেলেকে পাহারা দেন, ছেলে কি মাইন্ড করে না; তিনি বলেন, ছেলে তো মাইন্ড করে। আসার কারণ হচ্ছে ঢাকা শহর যে কোচিং সেন্টারগুলো আছে তারমধ্যে ইংলিশ মিডিয়াম এটা মাদক কারবারিদের একটা সেন্টার টার্গেট। কারণ এদের পরিবারের পকেটে টাকা আছে, এদেরকে একবার যদি ঢুকানো যায় তখন আরও অনেক কাস্টমার করে দিবে। মাস্টারমাইন্ড স্কুলের প্রিন্সিপালও একই কথা বললেন যে ইংলিশ মিডিয়ামের কোচিং সেন্টারগুলো ঢাকায় আছে এবং গুলশান বনানী উত্তরায় এগুলোর আশেপাশে ওৎ পেতে থাকে মাদক ব্যবসায়ীরা।’
রাজনৈতিক কমিটমেন্টের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের গ্রামে একটা খালি ঘরে কিছু ছেলেরা নেশা করত। পরে অনেক মিলে তাদের ওই ঘর থেকে তাড়িয়ে দেয়। পরদিন অনেক ছেলেপেলে এসে বাড়ি ঘেরাও করে বাড়িতে আক্রমণ করে বসে। আমি ভেবেছিলাম যারা নেশা করে ওরা পালিয়ে যাবে কিন্তু ওরা সঙ্গবদ্ধ হয়ে এসে আক্রমণ করে এবং প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বাড়ি ওরা ঘেরাও করে রাখে, কেউ বাড়ি থেকে বের হতে পারছিল না। আমি বললাম যে ওদের এত শক্তি কোথায়? জানলাম ওদের শক্তি হচ্ছে পলিটিশিয়ান। আশ্চর্য, আমার গ্রামের বাড়ি হচ্ছে উপজেলা থেকে পাঁচ কিলোমিটার ভেতরে গ্রামে। মাদক পাইকারি বিক্রেতা নিশ্চিতভাবে কোনো না কোনো ভাবে সমাজের কোনো প্রভাবশালী অংশ থেকে তারা প্রভাবিত অথবা তাদের ছায়ায় আছেন। সাত আট বছর আগে একজন পাইকারি বিক্রেতাকে ধরা হইলো। ধরার পরে দেখা গেল যে ওর সঙ্গে আরও অনেক লোকজন এসে পুলিশের কাছ থেকে তাকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল। কাজেই মাদক সমস্যা সমাধান করতে হলে সবার আগে পলিটিক্যাল কমিটমেন্ট প্রয়োজন। এবারের নির্বাচনি ম্যানিফেস্টোতে আমার কাছে মনে হয়েছে যে বিষয়টা সাফিসিয়েন্টলি এড্রেস হয় নাই। কমিটমেন্ট প্রয়োজন রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষ থেকে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের একদিক থেকে যেমন পলিটিক্যাল কমিটমেন্ট দরকার। আরেক দিক থেকে সমাজের প্রত্যেকেই এটার মধ্যে অংশগ্রহণ করা প্রয়োজন। পরিবার হিসেবে আমরা যে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। আমরা কিন্তু আমাদের বড় পরিবার থেকে ছোট পরিবারে চলে আসছি। ছোট পরিবারের মধ্যেও আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। আমরা ঘরে তো থাকি না। আর যদি থাকিও আমাদের সময়টা আমাদের সন্তানদেরকে আমরা যেভাবে দিচ্ছি এটার গুণগত মান সঠিক নয়। ঘরেই আছি আমরা ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় আছি।’
পরিবারের গুরুত তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আবার আমরা যারা বড় হয়েছি আমরা যারা ফ্যামিলির কর্তৃত্ব করছি। আমরা বুঝার চাইতে কর্তৃত্বটা বেশি করার চেষ্টা করি। এটাই আমাদেরকে আমাদের এই যে জেনারেশন যারা ১৭ থেকে ৩০ এর মধ্যে আছে তারা বিভিন্নভাবে মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। তারা এই নেশার দিকে চলে যাচ্ছে অথবা নেশা চলে যাচ্ছে এদের কাছে। বিজ্ঞান ভিত্তিক, পরিবার ভিত্তিক আমাদের অংশগ্রহণ করা প্রয়োজন। এটার মধ্যে ব্যক্তি পরিবার সমাজ স্কুল কলেজগুলো উপাসনালগুলো ধর্মীয় ব্যক্তিত্বগুলো আমরা যদি সবাই মিলে অংশগ্রহণ করি এটাকে প্রতিরোধ করা সম্ভব।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজকে যে গবেষণাটি হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এই ডিপার্টমেন্ট অব নারকোটিক্স কন্ট্রোলের আরও গবেষণা হোক। যে প্রতিষ্ঠানগুলো উনারা তৈরি করছেন রিয়েলি এটা আমাদের বড় ধরনের একটা চাহিদাকে পূরণ করবে। কিন্তু সঙ্গে আমরা এ বিষয়ে আমাদের নজর দেবার দরকার, যারা চিকিৎসা নিচ্ছে তাদের বড় অংশ আবার ফিরে যাচ্ছে পূর্বের জায়গায়। কেন ফিরে যাচ্ছে? আমাদের চিকিৎসাটা কি যথার্থ হচ্ছে কিনা, এই গবেষণা আরও অনেক করা লাগবে। আমরা দায় অনুভব করি। এই গবেষণা যারা করেছেন এবং একই সঙ্গে নারকোটিস ডিপার্টমেন্ট আগামী দিনের গবেষণায় এই সমস্যা থেকে উত্তোরণের পথ উত্তরণ করার জন্য ইমপ্লিমেন্টেশন রিসার্চগুলো হবে।’
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ। এই গবেষণার প্রধান গবেষক বিএমইউ এর ডীন অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী।
গবেষণাটি মাদকদ্রব্য নিযন্ত্রণ অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটি (বিএমইউ) ও রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্টস লিমিটেড যৌথভাবে ২০২৫ সালের ফেব্রুযারি থেকে জুন মাসের মধ্যে গবেষণাটি সম্পন্ন করে। গবেষণায দেশের আটটি বিভাগের ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলায় তথ্য সংগ্রহ করা হয়।