Saturday 04 Apr 2026
Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment

‘অবহেলা করে বাচ্চাকে হামের টিকা দেইনি, এখন ফল ভোগ করছি’

মেহেদী হাসান স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:০৫ | আপডেট: ৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:২১

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের হাম ইউনিটে ভর্তি শিশু

ঢাকা: অবহেলা করে বাচ্চাকে আমরা হামের টিকা দেইনি। ৯ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি কিন্তু কোনো উন্নতি হচ্ছে না। ভালোর কোনো লক্ষণ নাই। টিকা দিলে হয়তো এমনটা হতো না।— এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের হাম ইউনিটে ভর্তি শিশু আবু রায়হানের (১১) দাদা জাকির হোসেন।

সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘নোয়াখালীর রায়পুর থেকে আমরা এসেছি। গত ২৩ মার্চ আবু রায়হানকে হাসপাতালে ভর্তি করেছি। কিন্তু কোনো উন্নতি হচ্ছে না।’ শিশুটির অবস্থা বেশি ভালো না হওয়ায় এ সময় তার দাদিকেও কাঁদতে দেখা যায়।

সরেজমিনে হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, হাসপাতালটিতে হামে আক্রান্ত শিশু রোগীদের যথেষ্ট চাপ রয়েছে। হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডের ৪৬টি বেডের একটিও খালি নাই। ভর্তি হওয়া বেশিরভাগ শিশুর অবস্থাই ক্রিটিক্যাল। ভর্তি শিশুদের পুরো শরীরে লাল রেশ উঠে ভরে গেছে। কেউ কেউ শ্বাসকষ্টের জন্য একটু পর পর নিচ্ছে নেবুলাইজার।

বিজ্ঞাপন

হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মোহাম্মদ রিসালাতের (৯) পরিবার সারাবাংলাকে জানায়, নোয়াখালীর রামগঞ্জ থেকে এসে তারা এই হাসপাতালে শিশু রিসালাতকে ভর্তি করেছেন। ৩ দিন ধরে রিসালাত ভর্তি আছে। এখন ধীরে ধীরে সে সুস্থ হচ্ছে। এ ছাড়া, হাসপাতাল থেকে ভালো চিকিৎসা দিচ্ছে জানান রোগীর স্বজনরা।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের হাম ইউনিটে ভর্তি শিশু

হামে আক্রান্ত হয়ে শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে ৪ বছর বয়সী রোজা মনিকে। তার মা রাহেলা আক্তার সারাবাংলাকে বলেন, ‘ঢাকার মিরপুরে থাকি। আমার মেয়েকে হামের টিকা দেওয়া হয়নি। ওরা জমজ দুই বোন। এ জন্য আসলে ওদের সামাল দিতে পারিনি। তাই টিকাটাও দেওয়া হয়নি আমাদের ভুলের কারণে। কিছুদিন হলো হাসপাতালে ভর্তি করেছি। মেয়ে খাওয়া দাওয়া করে না। কিছু খেলেই রাখতে পারে না, বমি করে ফেলে দেয়।’

এদিকে, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে আগে কোনো হাম ওয়ার্ড ছিল না। দেশে হাম প্রকোপ আকার ধারণ করায় গত ২৩ মার্চ হাসপাতালটিতে ৪৬ বেডের হাম ওয়ার্ড চালু করা হয়। গত ২৩ থেকে ৩১ মার্চ পযন্ত হামে আক্রান্ত দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের উপ-পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. মো. আজহারুল ইসলাম সারাবাংলাকে বলেন, হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় কয়দিন হলো আমরা দ্রুত হাম ওয়ার্ড তৈরি করেছি। যারা ভর্তি হয়েছে তাদের বেশির ভাগই ক্রিটিক্যাল। আর এ কয়েকদিনে এখানে দু’জন শিশু মারা গেছে। তবে তাদের নিউমোনিয়া, ডায়েরিয়া ও শ্বাসকষ্ট ছিল। এ ছাড়া তারা আগে টিবি রোগীও ছিল। আমরা আমাদের সাধ্য মতো হামের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছি।

হঠাৎ হাম রোগ বেড়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমান পরিবেশে শিশুদের হয়তো রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে। কেউ কেউ টিকাই দেয়নি। আবার কেউ কেউ একটা টিকা দিয়েছে কিন্তু আরেকটা টিকা দিতে হয়তো ভুলে গেছে। তবে হাম রোধে পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। এতে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে। আর আমরা ঘরে গিয়ে বাচ্চাকে কোলে নেই, এটা করা যাবে না। বড়রা ঘরে ফিরে আগে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে তারপর বাচ্চাদের কাছে যেতে হবে। কারণ, অনেক জীবাণু আমাদের সঙ্গে প্রবেশ করতে পারে। পরিবারগুলো সময় মতো বাচ্চাদের হামের টিকা দিতে হবে।

দেশে উদ্বেগজনকভাবে হাম সংক্রমণ বেড়েছে। এর মধ্যে ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, পাবনাসহ কমপক্ষে সাত জেলায় রোগটি বড় আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। হামের ব্যাপারে যথাযথ মনোযোগ না দেওয়ায় পরিস্থিতি এ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের হাম হতে দেখা যাচ্ছে, অথচ টিকা দেওয়া হচ্ছে ৯ মাস ও এর পর থেকে। তাই এর বৈজ্ঞানিক কারণ খোঁজার জন্য অনেক আগেই মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছিল চিকিৎসকরা।

হাম প্রতিরোধে করণীর ও প্রতিকার সংক্রান্ত বিষয়ে রাজধানীর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার সারাবাংলাকে বলেন, অনেকে অবহেলা করে হামের টিকা দেয় না। আবার কেউ এক ডোজ দিয়ে পরেরটা দিচ্ছে না। এটা দেওয়া উচিত। যেহেতু হামের টিকা দেওয়ার জন্য শিশুর ৯ মাস বয়স হতে হবে, সেজন্য অনেকে টিকা দিতে পারছে না। এ জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। বুকের দুধ নিয়মিত খাওয়ালে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়। অনেকে এক-দুই মাস বুকের দুধ খাইয়ে পারিপার্শ্বিকতার কারণে আর খাওয়ায় না, এতে শিশু দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমতে থাকে।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের হাম ইউনিট

হাম ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ছোঁয়াচে হওয়ায় হামের শিশুদের একটু আলাদা রাখা ভালো। আমরা নিজেদের খেয়াল রাখি না, রোগ হলে আমরা চিকিৎসকের কাছে যাই না; হাম হলে যে আলাদা রাখা দরকার সেটা খেয়াল করা হচ্ছে না। বড় কারও হাম হলেও দিব্যি ঘুরছে, ছড়িয়ে দিচ্ছে এটা ঠিক না। শিশুদের যত্ন নিতে হবে, পরিষ্কার পরিছন্ন রাখতে হবে। হামে আক্রান্ত শিশুদের নিউমোনিয়া হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি। তাই আক্রান্ত হলে চিকিৎসা নেওয়া খুবই জরুরি।

তিনি আরও বলেন, পর্যাপ্তভাবে পুষ্টিকর খাবার নিশ্চত করতে হবে। আর প্রত্যন্ত এলাকার লোকজন এখনও সচেতন না। তারা বুঝতেছে না যে হাম হয়েছে। রেশ উঠলে তারা মনে করছে যে চুলকানি হয়েছে। বিনা মূল্যে টিকা দেওয়া হচ্ছে সেটা নিতেও তারা অবহেলা করছে।

বিজ্ঞাপন

আরো

মেহেদী হাসান - আরো পড়ুন
সম্পর্কিত খবর